বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

যৌতুক! সে তো মানবতার সাথে কৌতুক

Author

আখতার হোসেন আজাদ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৮ আগস্ট ২০১৯ পাঠ: ২৫ বার

রাত ১ টা। কে আছো বাঁচাও! কে আছো বাঁচাও। চিৎকার শুনে ঘুম ভেঙে গেলে ঘর থেকে বের হয়ে দেখি প্রতিবেশী এক মহিলার গগন বিদারী আর্তনাদ। কাছে যেতেই দেখি তার স্বামীর রক্তাক্ত শরীর। পরে জানতে পারলাম, যৌতুকের দাবিকৃত টাকা দিতে না পারার জন্য জামাই শ্বশুরের বাড়িতে বেড়াতে এসে এই গভীর রাতে শ্বশুরকে মারধর করে পালিয়ে গেছে। ঘটনাটি গত রবিবারের। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী গ্রামে। এটি নিছকই একটি উদাহরণ মাত্র। দেশের বিভিন্ন স্থানে এরকম ঘটনা ঘটছে অহরহ। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই মুখ খোলে না, কেউবা আবার প্রাণপ্রিয় মেয়েটির সুখের কথা ভেবে বরপক্ষের শত অন্যায় আবদার নিরুপায় হয়েই পূরণ করে থাকেন।
যৌতুক প্রথা আদিকাল থেকেই সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়ে আছে। কিন্তু বর্তমানে এটি যেন একটি জাতীয় সমস্যায় উপনীত হয়েছে। পত্রিকার পাতায় নারী নির্যাতনের যেসব চিত্র ফুটে আসে তার অধিকাংশই যৌতুকের কারণে সংঘঠিত। আবার যৌতুকের কারণে যেসব নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তার একটি ক্ষুদ্র অংশ আইন-আদালত কিংবা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পায়। আমাদের দেশে নব-বধূকে যৌতুকের জন্য আগুনের ছেঁকা দেওয়া, চুল কেটে ফেলা, এসিড নিক্ষেপ করা, অমানবিকভাবে শারীরিক নির্যাতন করতে করতে হত্যা করার বহু ঘটনা রয়েছে। তবে পূর্বের থেকে যৌতুকের কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা কমেছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে যৌতুকের পরিমাণ কমেছে। বরং মানুষের আর্থিক অবস্থা আরও বেশি স্বচ্ছল হবার ফলে বরপক্ষের দাবিকৃত যেকোনো অন্যায় আবদার এখন মুখ বুজেই পূরণ করে থাকে কনেপক্ষ। আবার যৌতুক চাওয়ার ধরণও বদলে গেছে। বরপক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আমাদের কোনো ডিমান্ড নাই। আপনাদেরই মেয়ে, খুশি হয়ে যা দিবেন তাতেই আমরা খুশি। বিয়ের কিছুদিন পর ব্যবসা বা বিদেশ যাবার কথা বলে বাবার বাসা থেকে অর্থ আনতে চাপ প্রয়োগ করা হয় নব-বধূকে। কখনও সরাসরি চাপ প্রয়োগ না করে কৌশলে বলা হয়; মেয়ে তো আপনাদেরই। মেয়ের সুখের জন্য জামাইকে ব্যবসা বা চাকুরির জন্য এতো পরিমাণ টাকা দেন। অসহায় বাবা নিরুপায় হয়ে জমি বিক্রয় করে বা ঋণ নিয়ে মেয়ের সুখের জন্য অন্যায়ভাবে দাবীকৃত অর্থ প্রদান করে থাকেন। বর্তমানে সমাজে এই ব্যাধি এতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে যেন কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে মেয়ের বাবা পাপই করে ফেলেছেন!
পূর্বে গ্রামাঞ্চলে দেখা যেত বরপক্ষ থেকে রেডিও, হাতঘড়ি, সাইকেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কনে পক্ষের থেকে চাপ প্রয়োগ করে আদায় করা হতো। কিন্তু হাস্যকর মনে হলেও বাস্তব যে আমরা যত বেশি শিক্ষিত হচ্ছি, নিজেদের যত উন্নত সভ্যতার নাগরিক হিসেবে দাবী করছি না কেন সেই শিক্ষিত সমাজেই যৌতুকের দাবী ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করছে। যত বেশি শিক্ষিত জামাই, যৌতুক যেন ততই উচ্চমূল্যের। বর্তমানে ফ্ল্যাট, গাড়ি, শোফা, আলমারি, মোটা অঙ্কের নগদ অর্থ, উচ্চাভিলাষী আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী দাবী করা হয়।
সাধারণত যৌতুক বলতে বিয়ের সময় কনে পক্ষের কাছ থেকে বরপক্ষের দাবী-দাওয়াকে বোঝালেও বর্তমানে আইনের দৃষ্টিতে বিয়ের সময় যে কোনো পক্ষ হতে দাবী-দাওয়াকেই যৌতুক বলে। আমাদের এই উপমহাদেশে যৌতুক প্রথার উৎপত্তি ঘটেছে হিন্দু সমাজে প্রচলিত পণ প্রথার মাধ্যমে। হিন্দুদের ধর্মীয় রীতি অনুসারে বাবার কোনো সম্পত্তিতে কন্যারা ভাগ পায় না বলে বিয়ের সময় উপঢৌকন হিসেবে মূল্যবান সম্পত্তি বা অর্থ উপহার দেবার রেওয়াজ বহুকাল থেকে প্রচলিত, তবে তা কেবল উচ্চবিত্ত ও সামর্থ্যবান পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কালক্রমে তা মুসলমান সমাজে অনুপ্রবেশ করে।
১৯৮০ সালে প্রণয়ন করা আইনটি ২০১৮ সালে সংশোধন করে নতুন করে প্রনয়ন করা হলেও দেশে যে যৌতুক লেনদেনের পরিমাণ যে কমেছে তা খুব গর্বের সাথে দাবী করা যাবে না। ১৯৮০ সালের আইনে বেশ কিছু ফাঁক-ফোকর ছিল যার ফলে পারিবারিক কোনো কলহের কারণে যখমের শিকার হলেও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য যৌতুকের নামে মিথ্যা মামলা দেবার অভিযোগ উঠে আসছিল। পরবর্তীতে যৌতুকের সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করে ও মিথ্যা মামলার ফলে শাস্তির বিধান রেখে নতুন আইনটি পাস করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- কোনো নারীর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি, অভিভভবক, আত্মীয় বা স্বামীর পক্ষের অন্য যেকোনো ব্যক্তি যৌতুকের জন্য কোনো নারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করলে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হবেন। যৌতুকের জন্য মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা (প্ররোচিত করে) করলে যাবজ্জীবন কারাদন্ড, মারাত্মক জখমের জন্য যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড বা অনূন্য ১২ বছরের সশ্রম কারাদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে মিথ্যা-ভিত্তিহীন অভিযোগে মামলার সাজার বিধান এনে। নতুন আইনে যৌতুক নিয়ে মিথ্যা মামলা করলে সর্বনিম্ন ৬ মাসের এবং সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন আসতেই পারে যে, আইনের দৃষ্টিতে যৌতুক গ্রহণ ও প্রদান উভয়ই অপরাধ হলেও এটি বন্ধ হচ্ছে না কেন? সহজ ভাষায় আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব ও সচেতনতার অভাবের ফলেই সামাজিক এই বিষবৃক্ষের মূলোটৎপাটন করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার আইনের যাতাকলে কেউ পিষ্ট হতে চান না বলে অভিযোগও করতে চান না। থানায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সঠিক বিচার প্রাপ্তির অভাব, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, অর্থব্যয়সহ বিভিন্ন কারণে নারীরা বিশেষ করে গ্রামের নারীরা নীরবে এই নিপীড়ন সহ্য করে থাকেন। যৌতুক বা কোনো নির্যাতনের শিকার হলে সরকার কর্তৃক চালুকৃত হটলাইন নাম্বার ১০৯-এ কল দিয়ে তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানো যেতে পারে। এছাড়াও যৌতুকের জন্য স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি থেকে বারবার চাপ আসলে নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা যেতেও পারে। এছাড়াও প্রতিটি জেলা শহরে লিগ্যাল এইড সার্ভিস থেকে সম্পূর্ন বিনামূল্যে মামলা করা ও আইনি লড়াই চালানো যায়।
তবে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে কেউ যেন পেরুতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যৌতুক অপরাধী যেই হোক না কেন, আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং অসাধু আইনজীবীদের দৌরত্মে ভুক্তভোগী যেন সুবিচার থেকে বঞ্চিত না হন, সেদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রাণালয়কে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমাজ থেকে এই জঘন্য রীতি দূর করা সম্ভব হবে না। সকলের একটুখানি সচেতনতা গড়ে তুলতে পারে যৌতুকবিহীন সমাজ গড়তে। তার জন্য চালাতে হবে সম্মিলিত প্রয়াস। যৌতুক সম্পর্কে সচেতনতা সৃিষ্টর জন্য গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। তরুণদের মধ্যে যৌতুক বিরোধী মনোভাব জাগ্রত করতে হবে, যৌতুকবিহীন বিয়েতে তাদের উৎসাহিত করতে হবে, তরুণীদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে তুলতে উদ্ভুদ্ধ করতে হবে ও তা বাস্তবায়নে যথাযথ প্রকল্প নিতে হবে। এলাকাভিত্তি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। মসজিদ, মন্দির, গির্জাসহ সব উপাসনালয়ে ও ধর্মীয় আলোচনাসভায় যৌতুকের কুফল বর্ণনা করতে হবে। জনপ্রিয় লেখক, সাহিত্যক, নায়ক, গায়ক, খেলোয়ারসহ সকল শ্রেনী-পেশার মানুষদের যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে হবে। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, নাটক, সিনেমাসহ গণমাধ্যমে এ ঘৃণ্য প্রথার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাতে হবে। দেশের এনজিও গুলোকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। বছরের একটি দিনকে যৌতুক বিরোধী দিবস হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। বিয়েতে উপহার প্রথা বন্ধ করতে পারলে দেশে যৌতুক প্রথার কিছুটা হলেও হ্রাস করা সম্ভব। কারণ উপহার দিয়ে মূলত যৌতুক প্রথাকেই পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করা হয়।

লেখক: প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৮ আগস্ট ২০১৯ তারিখে দৈনিক জনতা পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।