বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কী শিক্ষা পাচ্ছি এমন ওয়াজ মাহফিল থেকে?

Author

আখতার হোসেন আজাদ , ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০১৯ পাঠ: ৩৪ বার

ইসলাম অর্থ শান্তি। ঘরে-ঘরে ইসলামের আহ্বান পৌঁছে দেওয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়ে থাকে। কিন্তু আগেকার দিনের ওয়াজ মাহফিল আর বর্তমানের ওয়াজ মাহফিলের মধ্যে অনেক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। পূর্বে গ্রাম-গঞ্জে বা নির্দিষ্ট এলাকায় বছরে দুই-একটি মাহফিলের আয়োজন করা হতো। তখন মাহফিলের আয়োজন করা হলে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করত। কিন্তু বর্তমানে যেন বক্তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য সমাজে মানুষদের সুকৌশলে বিভিন্ন দল-উপদল ও মতের ভিত্তিতে ভাগ করে ফেলেছেন। ফলে মতাদর্শনুযায়ী এখন একই এলাকার পাড়ায় পাড়ায় আলাদাভাবে অনেক সংখ্যক মাইক ব্যবহার করে মাহফিলের আয়োজন করা হয়ে থাকে।

চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, অত্যধিক শব্দে মাইক ব্যবহার মানবদেহে বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে থাকে। সাধারণত ৫০ ডেসিবলের অধিক শব্দ হলে কানের সেল ক্ষতি হয়, উচ্চ রক্তচাপ বাড়ে। এটি আইনত দন্ডনীয়ও বটে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করা হয়। বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদন্ড বা অনধিক ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড এবং পরবর্তীতে একই অপরাধের জন্য ছয় মাসের কারাদন্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবার বিধান রয়েছে। ইসলামী মাহফিলের সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনা করে উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহারের বিকল্প খোঁজা এখন অনেক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ উচ্চ শব্দে গভীর রাত পর্যন্ত মাইক ব্যবহারের ফলে শিশু-বৃদ্ধদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। সমাজে অসুস্থ ব্যক্তিও থাকতে পারে, আবার অনেক শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা থাকলেও তার পড়ার কোনো উপায় থাকেনা। মাহফিল যেহেতু একটি নির্দিষ্ট মাঠে হয় সেখানে সাউন্ড বক্সের ব্যবহার সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে পারে।

ওয়াজ মাহফিল আমাদের উপমহাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের একটি ঐতিহ্যগত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। ইসলামের সুমহান বানী প্রচার ও সঠিক পথে মানুষকে চলার আহ্বানের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ফেসবুক ও ইউটিউবের কল্যাণে ওয়াজ মাহফিল কেবলমাত্র ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা শোনা যায় বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে। আমাদের দেশের মানুষেরা অতীব ধর্মপ্রাণ। ধর্মীয় নেতাদের বক্তব্যকে তারা মন থেকে গ্রহণ করে। কিন্তু বর্তমানে যে পরিমাণে বক্তার বাম্পার ফলন হয়েছে আমাদের দেশে তা রীতিমত দেশের সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলছে। অধিকাংশ বক্তা ভিত্তিহীন ধর্মীয় আবেগপ্রবণ বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে অবান্তর উত্তেজনার সৃষ্টি করছেন। একজন বক্তা আরেকজন বক্তার বক্তব্যকে ভুল ও বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়ে একে অন্যের সাথে কাঁদা ছোঁড়াছোড়িতে লিপ্ত থেকে নিজেরাই জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছেন। আবার অনেক বক্তাকে নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের বিরোধিতা করে নারী বিদ্বেষী বিভিন্ন কুরূচিশীল বক্তব্য দিতে দেখা যায়। যার ফলে নারী শিক্ষা নিয়ে জনমনে বিভক্তির সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়াও কিছু কথিত ধর্মীয় বক্তা বিভিন্ন অপপ্রচার ও সম্পূর্ণ বানোয়াট তথ্য-উপাত্তহীন উস্কানিমূলক কথা বলে মাহফিলকে যেন সরকার বিরোধী বক্তব্য প্রদানের ময়দানে পরিণত করছেন। ওয়াজ মাহফিলের মূল উদ্দেশ্য হল মানুষকে ধর্মের বানী শোনানো, ইসলামের সুমহান পথে আহ্বান, সৎ পথে আদেশ এবং অসৎ পথে নিষেধ; যা মহান আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসূলগণ করে গেছেন। কিন্তু বর্তমানে বক্তাদের একে অপরের প্রতি উপহাসমূলক বক্তব্য প্রদানের ফলে মাহফিল পরিণত হয়েছে যেন গীবত ও বিষেদাগার করার মঞ্চে। এক বক্তা আরেক বক্তাকে কাফের বলা, মুনাফিক-বিদআতি, ইসলামচুত্য প্রভৃতি নামে কটুক্তি করেন। আবার ইসলামের মূল বিষয়গুলোকে এক পাশে রেখে সামান্য বিষয়গুলোকে নিজের মনগড়া ব্যাখা করে সমাজে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি নষ্ট করছেন। প্রায় সব বক্তা নিজের মতাদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে বক্তব্য দেন এবং মতাদর্শগত বিরোধ নিয়ে চড়াও হন। নামাজে হাত বাঁধা, সূরা ফাতিহার পর জোরে আমিন বলা, হাত তুলে মোনাজাত করা বা না করা, রাসূল সা. নূরের নাকি মাটির তৈরি, কবরে বেঁচে আছেন কি না মারা গেছেন এইসব বিষয় নিয়ে মুসলমান সমাজে বিভক্ত সৃষ্টি করে রেখেছেন। কখনও কখনও এইসব বিভক্তি থেকে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয় এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে এই মতপার্থক্যের ফলে প্রাণহানির উদাহরণও রয়েছে।
আবার কিছু বক্তা ওয়াজে এমন ভঙ্গিমা করে হাস্যরসাত্মক ও মনগড়া বক্তব্য করেন মনে হতেই পারে যেন তিনি কোনো কমেডি অনুষ্ঠানে এসেছেন। আরেকটি বিষয়ে দেশের আলেম-ওলামারা প্রায়ই উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকেন। কথিত শিশুবক্তা দ্বারা বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে আলোচনা করানো হয়। একজন শিশুর পক্ষে ইসলাম সম্পর্কে কতটুকুই বা জানা সম্ভব যা দ্বারা মাহফিলের মতো জায়গায় আলোচনা করতে পারে! শিশুদের মাহফিলে প্রধান বক্তা বা বিশেষ বক্তা করা হলে বিভিন্ন হাস্যরসাত্মক কথা বলে যা ইসলামের কোথাও বর্ণনা নেই। ফলে শিশুবক্তার ওয়াজের নামে একদিক দিয়ে ইসলামের অপপ্রচার ও অপমানই করা হচ্ছে।

ওয়াজের নামে কখনও লাগামহীন কোনো কথা বলা উচিত নয়। পবিত্র কোরআনে সূরা নাহলের ১২৫ নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন- তুমি মানুষকে তোমার রবের পথে আহ্বান করো হেকমত ও সৎ উপদেশ দ্বারা এবং তর্ক করবে উত্তম পন্থায়। বর্তমানে বহু বক্তার ওয়াজের প্রধান বিষয় যেন ধর্মের নামে বিভিন্ন দল-উপদলের সৃষ্টি ও বিষেদাগার করা। হানাফি, সালাফি, আহলে হাদিস, কওমি, আলিয়া, দেওবন্দ, পীর-মুরিদিসহ বিভিন্ন দল ও মতের বক্তারা একে অপরকে অশ্রাব্য ভাষায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। শুধু তাই নয়, একে অপরকে ইহুদীদের দালার, কাফের, নাস্তির-মুরতাদদের দোসর বলে সম্বোধন করে যা শুনে সাধারণ মানুষের মন বিষাক্ত হয়ে উঠছে। ফলে দেখা যায়, বর্তমানের ওয়াজ মাহফিলে লোকসমাগম অনেক কম হয়ে থাকে।
আবার কোনও বক্তারা ইসলামের পর্দার বিধানের নামে নারীদের উদ্দেশ্য করে কটুক্তিমূলক কথা বলেন। ইসলামে নারীদের পর্দা সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখা রয়েছে; কিন্তু তা না বলে কোনো কোনো বক্তার আলোচনা শুনে মনে হয় তিনি যেন নারীদেরকে গৃহবন্দী করে রাখার জন্য ঠিকাদারী নিয়েছেন।

শুধু তাই নয়, কেউ কেউ জাতীয় বিষয়সমূহের বিভিন্নভাবে মন গড়া ব্যাখা দেন। সমাজে বিভেদ ছড়ানো বক্তব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষবাদ মুশরিকদের কাজ; শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া, নীরবতা পালন করা, জাতীয় সংগীত গাওয়া শিরক। আবার জঙ্গীবাদকে উসকে দেবার মতো বক্তব্যও দিতে দেখা যায় কোনো কোনো বক্তাকে। যেমন-আল্লাহর রাস্তা প্রতিষ্ঠার উত্তম জিহাদ হল সশস্ত্র জিহাদ, আল্লাহর রাসূলকে গালি দিলে কোপাতে হবে, কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা হয় সে নাস্তিক, তাকে হত্যা করা ওয়াজিব।

ওয়াজ মাহফিল নিয়ে আরেকটি বহুল আলোচিত বিষয় হল বক্তাদের সম্মানী। কোনো কোনো বক্তা চুক্তিভিত্তিক ওয়াজ মাহফিলে বক্তব্য রাখেন। তার দাবীকৃত টাকা প্রদান করা না হলে তিনি মাহফিল করতে আসেন না। আবার কোনও বক্তা সম্পর্কে শোনা যায় ঘন্টা প্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা নিতে! কিন্তু উনারা এইসবের আয়কর প্রদান করেন কি না সেটি আজও স্পষ্ট নয়। বর্তমানে বক্তার ইসলামের সুস্পষ্ট জ্ঞান ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা না করে কন্ঠ কার কত সুন্দর বেশি আর কে কত দর্শককে কৌতুক বলে হাসাতে পারে সেটিই যেন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ওয়াজ মাহফিলে বক্তাদের বক্তব্য সম্পর্কে নীতিমালা প্রস্তাব এসেছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামাদের নিয়ে ওয়াজ মাহফিল করার জন্য বক্তাদের যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ, সকল বক্তাদের নিবন্ধনের আওতায় এনে ওয়াজকারীদের তালিকা প্রণয়ন করা যেতে পারে। কিন্তু এদিকেও খেয়াল রাখতে হবে, নীতিমালার নামে যেন ওয়াজ মাহফিলের প্রতি কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়ে। প্রতিটি ওয়াজ মাহফিল হোক মানবতার কল্যাণে, ধর্মের আলোকিত আহ্বানের উদ্দেশ্য-এই প্রত্যাশা করি।

লেখক: প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১১ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
প্রকাশিত: দৈনিক সংবাদ
Paper Cutting
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।