খাদ্যে ভেজাল ও দূষণরোধে: প্রতিরোধ জরুরি
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য অতীব প্রয়োজন। কিন্তু সেই খাদ্য যদি নিরাপদ না হয় তবে তা মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে যায়। আমাদের সমাজে ভেজাল খাদ্য একটি মারাত্মক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সীমাহীন মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে খাবারে ভেজাল দিচ্ছে। প্রশ্ন যদি হয় ভেজাল খাবার মানে কি? সহজ ভাষায় সরল উত্তরটি হবে মূল খাদ্যদ্রব্য থেকে যদি কিছু সরিয়ে নেয়া হয় কিংবা তাতে অসৎ উদ্দেশে যদি নতুন কিছু যোগ করা হয় যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তাকেই ভেজাল বা দূষিত খাদ্য বলে। শিশুখাদ্য থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় সকল কিছুতেই রয়েছে ভেজালের ছড়াছড়ি। এসব ভেজাল মেশানোর ফলে খাদ্য দূষন হচ্ছে এবং এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ মানুষ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
ফসল কাটা থেকে খাদ্য গ্রহণ করার যেকোনো স্তরে সাধারণত দুই ভাবে খাদ্য দূষিত হয়ে থাকে। এক. জীবাণু সংক্রান্ত দূষণ অর্থ্যাৎ বিভিন্ন ধরনের জীবাণু, ছত্রাক দ্বারা দূষিত খাদ্য হয়ে মানবদেহে বিভিন্ন বিরূপ উপসর্গের সৃষ্টি হয়। দুই. রাসায়নিক দ্রব্যাদি দ্বারা দূষণ তথা পরিবেশ দূষণ সংক্রান্ত দ্রব্যাদি, পশুর ঔষধের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু বা অন্যান্য অবশিষ্টাংশ যা কারো অগোচরে খাদ্যে অনুপ্রবেশ করে। প্রশ্ন হতেই পারে মানুষ কেন খাদ্যে ভেজাল দেয়? এর কারণ পর্যালোচনা করলে মানুষের লোভী মনোবৃত্তির পরিচয় মেলে। অর্থের লালসা মানুষের চিরন্তন। সমাজজীবনে স্বাভাবিকভাবে চলতে গেলে তথা বাঁচতে গেলে অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই অর্থ উপার্জনের বিভিন্ন উত্তম পন্থা আছে। সৎ উপায়ে জীবিকা অর্জনের কথা অভিপ্রেত হলেও ঘরে বাইরে সর্বত্র মনুষ্যত্বের দীনতার চিত্র। সততা যেখানে লাঞ্চিত, অসহায়; বিবেক সেখানে বিবর্জিত। তাই মানুষ অর্থ উপার্জনের জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সেই অর্থ কালো পথেই আসুক বা সাদা পথেই আসুক কিংবা কারো রক্ত ঝরানোর মাধ্যমেই আসুক সেদিকে কারো খেয়াল থাকেনা। এই পরিণতিতে সমাজের উঁচু স্তর থেকে নিম্ন স্তর পর্যন্ত সর্বত্রই ভেজালের ছোঁয়া লেগেছে। তাই মানুষ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য-দ্রব্যতেও ভেজাল মেশাতে কুন্ঠাবোধ করে না। ভেজাল আমাদের দেশে বর্তমানে একটি জাতীয় সমস্যায় রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, “জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলে গণ্য হইবে। কিন্তু আমাদের দেশে খাদ্যে ভেজাল দেবার মাত্রা দিন দিন মারাত্মক আকার ধারণ করেই চলেছে। এখন প্রতিটি খাবারে ভেজাল দেবার হিড়িক পড়েছে। আম, কলাসহ বিভিন্ন ফলমূল পাকাতে ও আকর্ষণীয় করে রাখতে ফরমালিন ও কার্বাইড মেশানো হচ্ছে। শুটকি মাছে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর ডিডিটি। দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখার জন্য জিলাপী ও চানাচুর তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে পোড়া মবিল। বর্তমানে বিভিন্ন হোটেল গুলোতে খাবারের রং আকর্ষণীয় করে রাখতে জর্দার রং আর বিভিন্ন রাসায়নিক রং ব্যবহার করা হচ্ছে। রান্না করা হচ্ছে মরা মুরগি। দুর্গন্ধরোধে এসব মরা মুরগি রান্নার সময় ব্যবহার করা হচ্ছে লেবুর রস। শরবত, ঠান্ডা পানি ও লাচ্চিতে ব্যবহার করা হচ্ছে মাছের বরফ। এ থেকে খুব সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে বাংলাদেশে খাদ্য দূষণ কি মারাত্মক রূপ নিয়েছে।
খাদ্য ভেজালিকরণ উপাদানগুলো মানবদেহের নানা ক্ষতির কারণ। ক্ষতিকর এইসব রাসায়নিকগুলো ডায়রিয়া থেকে শুরু করে প্রায় ২০০টি রোগের কারণ। ভোক্তা অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ কনজুমার রাইটস সোসাইটির দেয়া তথ্য মতে, ভেজাল খাদ্য খেয়ে প্রতিবছর তিন লাখের বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছে। প্রায় দেড় লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিস ও ২ লাখ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কার্বাইডের কারণে তীব্র মাথা ব্যাথা, ঘূর্ণি রোগ, প্রলাপ হতে পারে। ক্যালসিয়াম কার্বাইডের ফলে কিডনি, লিভার, ত্বক, মূত্রথলি এবং ফুসফুসে ক্যান্সার হতে পারে।
চাষী বা উৎপাদনকারী থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ মহল পর্যন্ত সবাই ভেজালের সাথে জড়িত। বড় বড় অসৎ ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মিশিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। তারা উচ্চ মহলে ঘুষ দিয়ে সরকারি বিভিন্ন তদারকি কর্তৃপক্ষের মুখ বন্ধ রাখছে।
ভেজাল প্রতিরোধে বাংলাদেশ আইনের অভাব নেই। কিন্তু আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ভেজাল পণ্য উৎপাদন রোধে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে ভেজাল উৎপাদনের জন্য এই পর্যন্ত কাউকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হযনি। খাদ্য দূষণ ও ভেজাল রোধে বিশুদ্ধ খাদ্য আইন (সংশোধিত) ২০০৫, ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশ ২০০৯, ভোক্তা অধিকার আইন ২০০৯, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ সহ আরো বিভিন্ন আইন আছে
কেবলমাত্র আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্যে ভেজাল রোধ সম্ভব নয়। এজন্য উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সকলকে ভেজাল খাদ্যের অপকারিতা ও ক্ষতিকর দিক নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ রোধে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ জরুরি। কারণ প্রতিকার অনেক দীর্ঘপথ। আর প্রতিরোধ ছাড়া প্রতিকারও সম্ভব নয়। খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ রোধে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। খাদ্যে ভেজাল রোধে ভোক্তা অধিকার সম্পর্কিত সংগঠনগুলোকে আরো জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। ভারতে ভোক্তা অধিকার আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। সেখানে পণ্যে ভেজাল প্রমাণিত হলে ভোক্তা অধিকার কর্মীরা এগিয়ে আসে এবং ওই পণ্য বয়কটের জন্য আহ্বান করে। বিএসটিআই (Bangladesh standard and Testing Institution) কর্তৃপক্ষের উচিত পণ্যের মান নিশ্চিত করে অনুমোদন দেওয়া। এছাড়া এই কর্তৃপক্ষের কেউ দুর্নীতিগ্রস্থ হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের কিছু জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। খাদ্যপণ্যের মান নির্ণয়ে আরো কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। উৎপাদন থেকে ভোক্তার হাত পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের পৌঁছানো পর্যন্ত ক্রমাগত পরিদর্শনের আওতায় আনতে হবে এবং বিভিন্ন মন্ত্রাণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা। সাথে এটিও খেয়াল রাখতে হবে আইন প্রয়োগের নামে কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়।
সন্দেহাতীত ভাবে খাদ্যে ভেজাল একটি জাতীয় সমস্যা, জাতীয় বিপর্যয়। এটি আমাদের সবাইকে বিশেষ করে নীতিনির্ধারকদের সর্বাগ্রে সত্যিকারভাবে অনুধাবন করতে হবে। স্মরণে রাখতে সেই উক্তিটি- গবফরপরহব রং হড়ঃ যবধষঃযপধৎব ৎধঃযবৎ ঃযধহ ংরপশ পধৎব, ঋড়ড়ফ রং যবধষঃযপধৎব. কাজেই সুস্থ থাকার জন্য ভেজালমুক্ত খাবারের বিকল্প নেই। কিছু অসৎ ব্যবসায়ী ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার জন্য সমাজকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ভেজাল খাদ্য জাতিকে ঠেলে দিচ্ছে পঙ্গুত্বের দিকে। দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য খাদ্য সন্ত্রাসীদের রুখে দিতে হবে এবং নিরাপদ খাদ্যের দেশ গড়তে হবে।
