সিজারের প্রবণতায় স্বাস্থ্য ঝুঁকি
কিছুদিন আগে এক আত্মীয়ের নবজাতককে দেখতে গিয়েছিলাম। কথায় কথায় জানতে পারলাম, শিশুটির জন্ম হয়েছে সিজারিয়ানের মাধ্যমে। তখন আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আগে তো শুনেছিলাম নরমালেই হবে। কিন্তু সিজার করতে হলো কেন? উত্তর শুনে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বলেছিলেন, নরমাল ডেলিভারিতেই বাচ্চার জন্ম হবে কিন্তু ক্লিনিকে নিয়ে যেতেই বাইরে থাকা লোকগুলো বললো, মায়ের অবস্থা খুব খারাপ। এক্ষুনি সিজার করতে হবে। তাই দেরি না করে সিজারের মাধ্যমেই………
আমাদের দেশের অধিকাংশ ক্লিনিকগুলোতেই এইরকম মানসিক ব্ল্যাকমেইল করে প্রতারণা করা হচ্ছে। আমি এইরকম ঘটনা এর আগেও শুনেছি। কোনো রকম ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়াই সিজার করতে এক প্রকার বাধ্য করানো হয়।
সাধারণত প্রাকৃতিক নিয়মে জরায়ু কেটে সন্তান জন্ম নেবার পদ্ধতিটি বাংলাদেশে নরমাল ডেলিভারি হিসেবে পরিচিত। অপরদিকে মায়ের পেট কেটে সন্তান প্রসব করানোর পদ্ধতিটি সি-সিকশন বা সিজারিয়ান পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। অনেক মারাত্মক ঝুঁকি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে দিন দিন স্বাভাবিক প্রসবের চেয়ে সিজারিয়ান পদ্ধতিতে বাচ্চা জন্ম দেবার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। অনেক সময় আমার সেই আত্মীয়ের মতো মানসিকভাবে ব্ল্যাকমেইল করে সিজার করতে বাধ্য করা হয়। তাছাড়া আছে বেসরকারি ক্লিনিকসমূহের অর্থলিপ্সা, সরকারি ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠু না হওয়া, ডাক্তারদের নৈতিকতার অভাব, সরকারের মনিটরিংয়ের অভাব, জনগণের সচেতন না হওয়া প্রভৃতি। আবার অনেক পরিবার প্রসবের সময় রোগীকে কোনো প্রকার পেতে দিতে চাননা বলে স্বপ্রণোদিত হয়েই সিজারে আগ্রহ প্রকাশ করে থাকেন। দুঃখজনক হলেও একটি কথা সত্য যে, বর্তমানে সিজারিয়ান পদ্ধতির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাকে অনেকে ফ্যাশন হিসেবেও গ্রহণ করেছেন। যার ফলে বাংলাদেশে সিজারিয়ানের মাত্রা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে।
সম্প্রতি বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভবনের পেছনে ময়লার স্তূপে ৩২ টি নবজাতকসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়, রাস্তাঘাটে, ড্রেনে, বন-জঙ্গলে, ডাস্টবিনে অবৈধভাবে জন্ম দেওয়া অনেক নবজাতক পাওয়া যায়। এসব নিশ্চয়ই নরমাল ডেলিভারিতেই প্রসবিত শিশু। আবার মাত্র দিন কয়েক আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে এক ছাত্রীর নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেবার ফলে এখন প্রশ্ন আসছে, নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তানের প্রসব করা গেলেও হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গেলে কেন সিজারের প্রয়োজন পড়ছে? গর্ভবতী রোগীকে দেখলে ডাক্তারদের জিহ্বায় অর্থের লালা ঝরায় কি তাহলে এর মূল কারণ?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের তথ্য মতে জানা যায়, দেশে বর্তমানে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ২৩.৫ শতাংশ এবং বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে ৭১ শতাংশ সন্তান প্রসব করা হয় সিজারিয়ান পদ্ধতির মাধ্যমে। বিশ্বব্যাপী ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রসব সিজারিয়ান বা সি-সেকশন করানোর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঞঙ)। কিন্তু বাংলাদেশে এই মাত্রা ভয়াবহ আকারে ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি আইসিডিডিআরবি একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে বাংলাদেশের শতকরা ৯৫ ভাগ ক্লিনিকের আয়ের উৎস সিজারিয়ান অপরেশন।
বিবেকের কাছে মানুষ যদি পরাজিত হয়, তাহলে তার দ্বারা যে কোনো অপকর্মই সম্ভব। অকারণে সিজারিয়ান বন্ধের জন্য ডাক্তারদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারেরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কোন ক্লিনিক বা হাসপাতালে কতজন সিজারিয়ান পদ্ধতির মাধ্যমে নবজাতকের জন্ম হয়েছে তা মনিটরিং করতে হবে এবং কেন সিজারিয়ান করানো হয়েছে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে অধিকাংশ ডাক্তার, বিশেষ করে বেসরকারি ক্লিনিকের ডাক্তাররা প্রসূতি মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়াকে কেন্দ্র করে নোংরা বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন। প্রসূতি মায়েদের অকারণে ভয় দেখানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তাররাও অকারণে সিজারিয়ানের পথ বেছে নিতে বলেন। কারণ নরমাল ডেলিভারির চেয়ে সিজারিয়ানে যে অনেক বেশি টাকা! আবার নরমাল ডেলিভারী হলে সাধারণত ১-২ দিন পরেই মা সুস্থ হয়ে যায়। ফলে হাসপাতালে থাকতে হয়েনা। কিন্তু সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম হলে কমপক্ষে ১০ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। এতে কেবিন বা বেড ভাড়া, কথিত বিভিন্ন সার্ভিস চার্জের নামে বেশি টাকা আদায় করা সম্ভব হয় বলেও মালিকপক্ষ এবং ডাক্তারদের সিজারিয়ানের প্রতি আহ্বান চলে। পাশাপাশি দালালদের দৌরাত্মতো রয়েছেই। দেখা যায়, পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক অজ্ঞান করে সিজারিয়ান পদ্ধতিতে সন্তানের জন্ম দেওয়া হয় বলে সন্তান জন্মের পরে মা অতৃপ্তি, বাচ্চার সাথে দূর্বল সম্পর্ক ও মানসিক চাপসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভোগেন। আজীবন মা ও শিশুর মধ্যে যে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হবার কথা ছিল তা আজীবনেও তৈরি হয় না। সিজারিয়ান পদ্ধতির মাধ্যমে বাচ্চা প্রসব করলে ৩-৪ দিন মা শিশুকে দুধ খাওয়াতেও পারেন না যেখানে নরমাল ডেলিভারীতে কছেশ ঘন্টা পরেই তা সম্ভব হয়। মায়ের শাল দুধ বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সিজারিয়ানের দ্বারা জন্ম নেওয়া শিশুটি এটি থেকে বঞ্চিত হবার জন্য শারীরিকভাবে দূর্বল হয়। অনেক সময় কাঁচির আঘাতে বাচ্চা ক্ষত বিক্ষতও হয় যা কখনও ডাক্তাররা এড়িয়ে যান। আবার প্রথমবারেই সিজারিয়ানের মাধ্যমে সন্তানের জন্মের ফলে পরের সন্তান প্রসবের সময় মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই অবিলম্বে অকারণে সিজারিয়ান বন্ধ, এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনকেও অত্যাধিক মাত্রায় হাসাপাতালগুলোতে তদারকি করতে হবে। তবেই সুস্বাস্থ্যের অধিকারী জনগণ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ উপহার পাবে। একটি কথা ভুলে গেলে চলবেনা, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।
