মাতৃআরাধনার আলোয় অসুরবৃত্তির অন্ধকার
মাতৃআরাধনার আলোয় অসুরবৃত্তির অন্ধকার
“যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ। যত্রৈতাস্তু ন পূজ্যন্তে সর্বাস্তত্রাফলাঃ ক্রিয়াঃ॥” অর্থাৎ, যেখানে নারীরা সম্মানিত হন, সেখানে দেবতারা আনন্দিত হন; আর যেখানে নারীরা সম্মানিত হন না, সেখানে মানুষের সব কর্মই নিষ্ফল হয়ে যায়। ঋষি মনুর এই সনাতন উক্তি নিছক ধর্মীয় কোনো উদ্ধৃতি নয়; এটি নারীর মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে একটি গভীর মানবিক উপলব্ধি। অথচ আজকের সমাজে এই বাণীর সঙ্গে আমাদের বাস্তবতার যেন এক নির্মম বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে। শারদীয় প্রাতে শুরু হয়েছে দেবী বন্দনা। চারদিকে উৎসবের আমেজ, মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী আরাধনা , ঢাকের বাদ্য আর আলোকসজ্জা। দেবী দুর্গা কেবল একটি ধর্মীয় স্বরূপ নন; তিনি শক্তির প্রতীক, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির প্রতীক, অন্যায় ও অসুরবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। মহিষাসুরকে পরাজিত করে দেবীর বিজয় তাই প্রতীকী অর্থে অন্যায়ের ওপর ন্যায়ের চিরন্তন বিজয়। দেবী চরণ তলে আমরা যে অসুরবধের দৃশ্য দেখি, সমাজের বাস্তব জীবনে সেই অসুরবৃত্তির বিরুদ্ধে আমরা কতটুকু লড়াই করছি? একদিকে আমরা নারীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করি, অন্যদিকে সেই নারীকেই অনেক সময় অবমাননা, নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হতে হয়। নারী ঘরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা জনপরিসরে নানা ধরনের হয়রানি ও বৈষম্যের মুখোমুখি হন। কোথাও তার চলাফেরাকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, কোথাও পোশাককে দায়ী করা হয়, কোথাও তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করার চেষ্টা চলে। আরও ভয়াবহ হলো, নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনাকে অনেক সময় সামাজিকভাবে স্বাভাবিক করে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়। নারীর প্রতি সহিংসতা কেবল শারীরিক আঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কটূক্তি, যৌন হয়রানি, অনলাইনে বিকৃত কথা, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার, মানসিক নির্যাতন, যৌতুকের চাপ, পারিবারিক নিপীড়ন সবই নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতার ওপর আঘাত। এসব আচরণের পেছনে কাজ করে এমন একটি মানসিকতা, যেখানে নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ, ভোগ কিংবা প্রদর্শনের বস্তু হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে আধুনিক ভোগবাদী সংস্কৃতিতে নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। একজন নারী যে একজন মানুষ তার স্বপ্ন, মেধা, শ্রম, অনুভূতি ও আত্মমর্যাদা রয়েছে এই মৌলিক সত্যটি যেন অনেক সময় দৃশ্যপটের আড়ালে চলে যায়।
এখানেই দুর্গাপূজার তাৎপর্য নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। দেবী দুর্গার আরাধনা যদি শক্তির আরাধনা হয়, তবে সেই শক্তির অন্যতম প্রকাশ হওয়া উচিত নারীর প্রতি সম্মান। দেবীকে পূজা করে জীবন্ত নারীর প্রতি অসম্মান দেখানো আমাদের আচরণের একটি গভীর অসংগতি। মণ্ডপে দেবীর আরাধনা করে ফিরে এসে যদি কোনো নারীকে অপমান করি, তার স্বাধীনতাকে খর্ব করি কিংবা তার নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করি, তবে আমাদের উৎসবের অন্তর্নিহিত শিক্ষাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। মহিষাসুরের প্রতীকী বধ তাই শুধু প্রতিমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সমাজের প্রকৃত অসুরবৃত্তি হলো সেই মানসিকতা, যা অন্যের মর্যাদা কেড়ে নিতে চায়; যে মানসিকতা নারীকে দুর্বল ভেবে তার ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ করে; যে মানসিকতা নারীর ‘না’-কে ‘না’ হিসেবে গ্রহণ করতে শেখেনি; যে মানসিকতা অপরাধীর পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই অসুরবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে প্রথমে নিজেদের চিন্তা ও আচরণের দিকে তাকাতে হবে।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা রাষ্ট্রের নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী সবাইকে ভূমিকা নিতে হবে। পরিবারে ছেলে ও মেয়েকে সমান মর্যাদা দেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম্মানজনক আচরণ, সম্মতি ও মানবিকতার শিক্ষা আরও গুরুত্বের সঙ্গে দিতে হবে। অপরাধ ঘটলে সামাজিকভাবে সেটিকে আড়াল না করে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে হবে এবং অপরাধীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। নারীকে সম্মান করা কোনো দয়া নয়, এটি তার মৌলিক অধিকার। নারীকে নিরাপদে চলাফেরা করার সুযোগ দেওয়া কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি একটি সভ্য সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। একজন নারী কী পরবেন, কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে কথা বলবেন এসবের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। বরং পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক মূল্যবোধ এবং দায়িত্বশীল আচরণ পরিবর্তন করাই জরুরি। দুর্গাপূজার আলোয় তাই আমাদের নিজেদের সমাজটাকেও একবার দেখতে হবে। মণ্ডপে দেবী দুর্গার হাতে অস্ত্র, পায়ের নিচে মহিষাসুর। কিন্তু সমাজের ভেতরে থাকা অসুরবৃত্তি যদি আমাদের চিন্তা, আচরণ ও সংস্কৃতির মধ্যে টিকে থাকে, তাহলে শুধু মৃন্ময়ী সামনে প্রদীপ জ্বালালেই অশুভ দূর হবে না।
মাতৃআরাধনার প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন জীবন্ত মায়ের, বোনের, কন্যার কিংবা সহকর্মীর মর্যাদাও সমানভাবে রক্ষা করা হবে। দেবীর আরাধনা হোক শক্তির, আর সেই শক্তির প্রথম প্রকাশ হোক নারীর প্রতি সম্মান। মণ্ডপে মহিষাসুরের বধ প্রতিবছরই হয়। এবার হোক আমাদের ভেতরের অসুরবৃত্তির বিরুদ্ধেও এক প্রতীকী বিজয়।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে
প্রতিদিনের সংবাদ
পত্রিকায় প্রকাশিত।
