জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার সংস্কৃতি চাই
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার সংস্কৃতি চাই
উচ্চশিক্ষা মানেই যে শুধু পাঠ্যবই পড়া, নিয়ম করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং একটি সনদ অর্জনের মাধ্যমেই ইতি টানা, তেমনটা নয়। উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করা, চিন্তার পরিধি বাড়ানো, শুভ যুক্তি চর্চা, গবেষণামুখী করে তোলা এবং বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা। শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার প্রধান জায়গা হলেও শ্রেণিকক্ষের বাইরের জ্ঞানচর্চাও একজন শিক্ষার্থীর সামগ্রিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর এই জায়গায় নিয়মিত সেমিনার হতে পারে অত্যন্ত কার্যকর একটি মাধ্যম। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার সংস্কৃতি চালু হওয়া আবশ্যক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তাদের অনেকেই পুরো শিক্ষাজীবন নিজ নিজ কলেজে কাটান। ফলে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা পেশাজগতের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের সুযোগ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সীমিত। নিয়মিত সেমিনার আয়োজনের মাধ্যমে এই সীমাবদ্ধতা অনেকাংশে দূর করা সম্ভব। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কলেজগুলোতে যদি গবেষক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা, পেশাজীবী ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের পাঠ্যসূচির বাইরেও বাস্তব ও সমসাময়িক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন। একটি সেমিনার একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার জগতে নতুন দরজা খুলে দিতে পারে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শুধু ভালো ফলাফল একজন শিক্ষার্থীর সফলতার নিশ্চয়তা দেয় না। একজন শিক্ষার্থীর যোগাযোগ দক্ষতা, উপস্থাপনা, সমালোচনামূলক চিন্তা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, দলগত কাজ, নেতৃত্ব এবং গবেষণার প্রাথমিক ধারণাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেমিনার এসব দক্ষতা বিকাশের একটি কার্যকর ক্ষেত্র হতে পারে। নিয়মিত সেমিনারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা অন্যের বক্তব্য শোনা, প্রশ্ন করা, নিজের মতামত প্রকাশ করা এবং যুক্তির মাধ্যমে আলোচনা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। বিশেষ করে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি তৈরিতে সেমিনারের গুরুত্ব অনেক। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু সেমিনারের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের আরও স্বাধীনভাবে প্রশ্ন ও মতামত প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং কোনো বিষয়কে শুধু মুখস্থ করার পরিবর্তে বিশ্লেষণ ও যুক্তির মাধ্যমে বোঝার প্রবণতা তৈরি হবে। একজন শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য এই অভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও সেমিনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণা কীভাবে শুরু করতে হয়, একটি গবেষণার বিষয় কীভাবে নির্বাচন করতে হয়, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ কীভাবে করা হয়, গবেষণাপত্র কীভাবে প্রস্তুত করতে হয় এসব বিষয়ে অভিজ্ঞ গবেষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধারণা পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা, স্কলারশিপ, গবেষণা ক্যারিয়ার ও পেশাগত সুযোগ সম্পর্কেও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পাওয়া সম্ভব। সেমিনার শুধু শিক্ষার্থীদের জ্ঞান বাড়ায় না; এটি একটি কলেজের একাডেমিক পরিবেশকেও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। নিয়মিত আলোচনা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ বাড়বে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কও আরও একাডেমিক ও সহযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে। তাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে সেমিনারকে বিচ্ছিন্ন বা আনুষ্ঠানিক কোনো আয়োজন হিসেবে না দেখে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চালু করা জরুরি। বিভাগভিত্তিক, কলেজভিত্তিক এবং আন্তঃবিভাগীয় পর্যায়ে সেমিনারের আয়োজন করা যেতে পারে। বিজ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তি, উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার, উদ্যোক্তা, পরিবেশ, সমাজ, সাহিত্য ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে সেমিনার আয়োজন করলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের উচ্চশিক্ষার একটি বিশাল অংশ। তাদের সম্ভাবনাকে শুধু পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাদের চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, গবেষণা করতে এবং বাস্তব জগতের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে শেখাতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে নিয়মিত সেমিনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কলেজ হয়ে উঠুক জ্ঞানচর্চা, প্রশ্ন ও নতুন চিন্তার প্রাণকেন্দ্র।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে
বাংলাদেশ বুলেটিন
পত্রিকায় প্রকাশিত।
