শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

শিক্ষার লক্ষ্য কি শুধু ভালো ফলাফল?

Author

বাপ্পাদিত্য চৌধুরী প্রবাল , মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ

প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৮১ বার

শিক্ষার লক্ষ্য কি শুধু ভালো ফলাফল?

যেকোনো পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আমাদের সমাজে যেন উৎসবের আবহ তৈরি হয়। কে কত পেল, কার জিপিএ কত, কে মেধা তালিকায় প্রথম এসব নিয়েই শুরু হয় আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে অভিনন্দনের বন্যা বয়ে যায়। ভালো ফলাফল অবশ্যই আনন্দের এবং একজন শিক্ষার্থীর পরিশ্রমের স্বীকৃতি। কিন্তু শিক্ষার লক্ষ্য কি শুধুই ভালো ফলাফল? যদি তাই হয়, তাহলে একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলেই কি আমরা ধরে নেব সে সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত হয়েছে? সে কি নিজের মতো করে চিন্তা করতে পারে? কোনো তথ্য সত্য না মিথ্যা যাচাই করতে পারে? সমস্যার সমাধান করতে পারে? অন্যের মতামতকে সম্মান করতে পারে? নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে? বাস্তব জীবনের জটিল পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে? যদি এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু ‘না’ হয়, তাহলে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে শিক্ষার সাফল্য মাপা নিঃসন্দেহে ভুল। শিক্ষার প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে জ্ঞানী করার পাশাপাশি চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। বইয়ের তথ্য জানা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, কেন ব্যবহার করতে হবে এবং তার সত্যতা কীভাবে যাচাই করতে হবে এই দক্ষতাগুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থী যদি পাঠ্যবইয়ের সব সংজ্ঞা মুখস্থ করতে পারে কিন্তু নিজের ভাষায় একটি ধারণা ব্যাখ্যা করতে না পারে, তাহলে সে মুখস্ত জ্ঞান কতটুকু কার্যকর এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই । আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার গুরুত্ব এত বেশি যে অনেক সময় পুরো শিক্ষাজীবনই পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীর লক্ষ্য হয়ে যায় পরীক্ষায় কী আসবে, কোন প্রশ্নের কত নম্বর, কীভাবে উত্তর লিখলে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে। অভিভাবকের প্রশ্ন হয়, ‘কত পেয়েছ, জিপিএ কত?’ শিক্ষকের সাফল্যও অনেক সময় শিক্ষার্থীর ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার একটি বড় অংশ জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে পরীক্ষায় ভালো করার কৌশলে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি অদ্ভুত মানসিকতা তৈরি হচ্ছে যা পরীক্ষায় আসবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ; যা পরীক্ষায় আসবে না, সেটি শেখার প্রয়োজন নেই। অথচ জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক দক্ষতার কোনো সরাসরি নম্বর নেই। ধৈর্য্য, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, দলগতভাবে কাজ করা, সৃজনশীলতা, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার মতো দক্ষতা পরীক্ষার খাতায় সহজে মাপা যায় না। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতা বিষয়ক প্রতিবেদনে বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা, সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বে শুধু তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা যথেষ্ট নয়; তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও প্রয়োজন। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের সময়ে এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। কিন্তু পাওয়া উত্তরটি সঠিক কি না, তার উৎস কতটা নির্ভরযোগ্য, তথ্যের মধ্যে কোনো ভুল বা পক্ষপাত আছে কি না এসব যাচাই করার জন্য মানুষের নিজস্ব চিন্তার প্রয়োজন। ভবিষ্যতের শিক্ষার্থীকে তাই শুধু তথ্য মনে রাখলে চলবে না; তাকে তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণ করতে জানতে হবে। এখানে প্রশ্ন করার সংস্কৃতির গুরুত্বও অনেক। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি শিক্ষার্থী শুধু শিক্ষকের কথা শুনবে, বইয়ের উত্তর মুখস্থ করবে এবং পরীক্ষায় সেটিই লিখবে। তাহলে তার চিন্তার বিকাশ সীমিত হয়ে যেতে পারে। বরং শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা দরকার। ‘কেন?’, ‘কীভাবে?’, ‘এর অন্য কোনো ব্যাখ্যা আছে কি?’ এই প্রশ্নগুলোই জ্ঞানকে গভীর করে। একজন শিক্ষক যদি কোনো বিষয় পড়ানোর পর শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘তোমরা কি এর সঙ্গে একমত? কেন?’ তাহলে সেখানে শিক্ষার নতুন একটি দরজা খুলে যায়। কারণ শিক্ষার্থী তখন শুধু উত্তর গ্রহণ করছে না; সে নিজের চিন্তা গঠন করছে। মতের পার্থক্য হলে যুক্তি দিয়ে আলোচনা করতে শিখছে। শিক্ষার লক্ষ্য তাই শুধু সঠিক উত্তর জানা নয়; সঠিক প্রশ্ন করতেও শেখা।
ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। একটি ভালো ফলাফল উচ্চশিক্ষা, বৃত্তি কিংবা কর্মজীবনের কিছু সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই পরীক্ষার ফলাফলকে অপ্রয়োজনীয় বলা যাবে না। সমস্যা হলো, যখন ফলাফল শিক্ষার একমাত্র মাপকাঠি হয়ে যায়। একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় ৯৫ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। কিন্তু যদি সে কোনো নতুন সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে সমাধান খুঁজে না পায়, নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায় কিংবা ভিন্নমতকে সহ্য করতে না পারে, তাহলে তার শিক্ষার কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এখনও অপূর্ণ রয়ে গেছে। আবার অন্য একজন শিক্ষার্থী হয়তো পরীক্ষায় তুলনামূলক কম নম্বর পেয়েছে, কিন্তু সে বই পড়ে, প্রশ্ন করে, নতুন কিছু তৈরি করে, গবেষণায় আগ্রহী এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে। শিক্ষার প্রকৃত অর্থে দ্বিতীয় শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকেও আমাদের মূল্যায়ন করতে হবে। এখানে অভিভাবকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু ‘কত কম পেয়েছ?’ প্রশ্ন না করে ‘কোন জায়গায় সমস্যা হয়েছে?’ বা ‘কীভাবে ভালোভাবে শিখতে পারো?’ এই প্রশ্ন করা আবশ্যক। একইভাবে ভালো ফল করলে শুধু নম্বরের প্রশংসা না করে তার শেখার আগ্রহ, পরিশ্রম ও চিন্তার ক্ষমতাকেও মূল্য দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পরিবর্তন প্রয়োজন। পরীক্ষার পাশাপাশি প্রকল্প, উপস্থাপনা, বিতর্ক, গবেষণা, বইপাঠ, সমস্যা সমাধান ও দলগত কাজের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের শুধু একটি নির্দিষ্ট উত্তর শেখানোর বদলে একই সমস্যার একাধিক সমাধান নিয়ে ভাবতে দেওয়া উচিত। এতে শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক তৈরি হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষার্থী একদিন স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে। সেখানে প্রতিদিন তার সামনে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থাকবে না। থাকবে বাস্তব সমস্যা, অনিশ্চয়তা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন। শিক্ষা মানুষকে যে শুধু চাকরি পাওয়ার যোগ্য করে তুলবে, এমনটিও নয়। শিক্ষা মানুষকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। সে নিজের অধিকার জানবে, অন্যের অধিকারকে সম্মান করবে, গুজব ও সত্যের পার্থক্য বুঝবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারবে এবং সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য এমন মানুষ প্রয়োজন, যারা শুধু নির্দেশ পালন করবে না; প্রয়োজন হলে প্রশ্নও করবে। শুধু প্রচলিত ধারণা মেনে নেবে না; প্রমাণ দিয়ে যাচাই করবে। ভুল হলে অন্যকে দোষারোপ না করে নিজের ভুল সংশোধন করবে। শিক্ষার আসল ফলাফল প্রকাশ পায় মানুষের চিন্তায়, আচরণে, মূল্যবোধে এবং সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধে। শিক্ষার লক্ষ্য ভালো ফলাফল হতে পারে, কিন্তু শুধু ভালো ফলাফল কখনোই শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়।
লেখক: সাধারণ সদস্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ৬ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ বুলেটিন পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।