বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু কি নির্মম পরিহাস নাকি অবচেতনের আত্নহনন

Author

মিথিলা আক্তার , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ১ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৪ বার

বাংলা কবিতার ইতিহাসে সবচেয়ে নির্জন, ধূলিধূসর অথচ রূপালি আলোর সাধক জীবনানন্দ দাশ। তাঁর কবিতা যেমন আমাদের চেনা জগতের সমান্তরালে এক অপার্থিব, রহস্যময় কুয়াশায় মোড়া অন্য এক জগতের সন্ধান দেয়, তেমনি তাঁর জীবনাবসানও এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ধাঁধা। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জ ল্যান্সডাউন রোডের মোড়ে ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হয়ে আট দিন পর, ২২ অক্টোবর শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ পথ দুর্ঘটনা হলেও তাঁর জীবন, মানসিক নিঃসঙ্গতা ও সৃষ্টির অন্তর্নিহিত সুর একসঙ্গে বিচার করলে প্রশ্ন জাগে—এ মৃত্যু কি কেবল নিয়তির নির্মম পরিহাস, নাকি সমাজ-সংসার থেকে মুক্তি পাওয়ার অবচেতন আকাঙ্ক্ষা?

জীবনানন্দ দাশ সারাজীবন এক তীব্র অন্তর্দাহ বুকে নিয়ে বেঁচে ছিলেন। সমকালীন সাহিত্যিকদের অবহেলা, বুদ্ধদেব বসু ছাড়া অনেকের উদাসীনতা এবং সজনীকান্ত দাসের লাগামহীন সমালোচনা তাঁকে সমাজ থেকে একপ্রকার নির্বাসনে ঠেলে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আর্থিক অনটন, একের পর এক চাকরি হারানো, দীর্ঘ বেকারত্ব এবং অশান্ত দাম্পত্য জীবন। তাঁর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ধীরে ধীরে বাস্তব জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছিলেন। দুর্ঘটনার আগের দিনগুলোতে তিনি প্রায়ই কলকাতার রাজপথে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে বেড়াতেন। চারপাশের বাস্তবতায় যখন প্রাপ্তির চেয়ে বেদনা বেশি, তখন অবচেতন মন মুক্তির পথ খুঁজতে পারে—এমন ধারণা অমূলক নয়।

মৃত্যুর পরে উদ্ধার হওয়া তাঁর ডায়েরি এবং কবিতার দিকে তাকালেও দেখা যায়, মৃত্যু তাঁর কাছে কেবল ভয় নয়; বরং এক ধরনের প্রশান্তির প্রতীক। জীবনের রূঢ়তাকে এড়াতে তিনি বারবার মৃত্যুর নীরব আশ্রয়ের কথা বলেছেন। তাঁর অন্তর্গত ক্লান্তিই কি তাঁকে বালিগঞ্জের সেই ট্রামলাইনের দিকে টেনে নিয়েছিল, নাকি সেটি ছিল অবচেতন মনেরই প্রকাশ?

শাহাদুজ্জামানের একজন কমলালেবু গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১৪ অক্টোবর সকালে সুবোধবাবু জীবনানন্দের বাড়িতে এসেছিলেন। বিকেলে একসঙ্গে হাঁটার কথা থাকলেও সুবোধবাবু অসুস্থতার কারণে যেতে পারেননি। ফলে জীবনানন্দ একাই বেরিয়ে পড়েন। তিনি ল্যান্সডাউন রোড হয়ে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ধরে গড়িয়াহাটা পর্যন্ত হাঁটেন। তখন হেমন্তকাল, চারদিকে ঝরা পাতা। কী ভাবছিলেন তিনি? পুরো পথ ঘুরে আবার রাসবিহারী মোড়ে ফিরে এলে বালিগঞ্জগামী একটি ট্রাম দ্রুত ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসে। ট্রাম এগিয়ে আসছে, তিনিও এগিয়ে যাচ্ছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, ট্রামচালক বারবার ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। তবুও কবি লাইনের ওপর থেকে সরে যাননি। একজন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে ধেয়ে আসা ট্রাম না দেখা বা ঘণ্টার শব্দ উপেক্ষা করা অস্বাভাবিক। তিনি কি গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন, নাকি অবচেতন মন তাঁকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল?

আমার ধারণা, তিনি অবচেতন মনেই ছিলেন। কারণ, যিনি সাধারণত আড্ডা ও জনসমাগম এড়িয়ে চলতেন, তিনিই মৃত্যুর অল্প আগে ১৯৫৪ সালে দুটি বড় অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন, যার একটি ছিল ১৩ অক্টোবরের রেডিও অনুষ্ঠান। ঠিক পরদিনই কি তিনি সচেতনভাবে মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যেতে পারেন? প্রশ্নটি থেকেই যায়।

অনেক গবেষক এ ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা বা নিয়তির পরিহাস বলে মনে করেন। তাঁদের যুক্তি, যে কবি ‘রূপসী বাংলা’র বুকে শঙ্খচিল বা শালিকের বেশে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন, তিনি স্বেচ্ছায় জীবন শেষ করতে চাইবেন কেন? আবার অন্যদিকে, দুর্ঘটনার কিছুদিন আগেই ১৯৫৩ সালে তিনি হাওড়া কলেজে ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। এমনকি চাকরি ছাড়ার আগে একটি বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনাও করেছিলেন এবং সে উদ্দেশ্যে জমিও দেখতে গিয়েছিলেন। এসব তথ্য তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।

তাই তাঁর মৃত্যুকে এককভাবে আত্মহত্যা কিংবা নিছক দুর্ঘটনা—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। আমার মতে, এটি ছিল অবচেতন মনের এক মুহূর্তের বিচ্যুতি, আর সেই বিচ্যুতিকে চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছে দেয় নিয়তির নির্মম পরিহাস। কারণ, ট্রামচালকের একাধিক সতর্কবার্তার পরও তিনি সরে যাননি, আবার একই সঙ্গে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও ছিল। এই দুই বিপরীত বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুরহস্য। হয়তো এই রহস্য কোনো দিন সম্পূর্ণ উন্মোচিত হবে না।

লেখক: উপ- প্রচার সম্পাদক, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে লেখাদূত সাহিত্য পত্রিকা পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।