ইডেন কলেজের ইতিহাসে বাংলা বিভাগের শ্রীমঙ্গলে চিরস্মরণীয় এক শিক্ষাসফর।
৩১শে আগস্ট ২০২৬, সবুজে ঘেরা প্রথম ভোর হতে শুরু হয় স্মৃতিময় এক শিক্ষা সফর। ইডেন মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের সবুজের আমন্ত্রণে, সাহিত্যের টানে ১৭৬ জন শিক্ষার্থীর কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছিল চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল। ইডেনের ইতিহাসে হয়তো এটাই ছিল কোনো বিভাগের পক্ষ থেকে আয়োজিত সবচেয়ে বড় এবং জাঁকজমকপূর্ণ শিক্ষাসফর। ইট-পাথরের দেয়ালঘেরা ক্লাসরুম ছেড়ে সাহিত্যের ছাত্রীদের এই পদচারণায় প্রকৃতির সবুজ ক্যানভাস যেন এক জীবন্ত কাব্যগ্রন্থে রূপ নিয়েছিল। তবে ১৭৬ জোড়া চোখের এই স্বপ্নীল ভ্রমণকে বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং পুরো আয়োজনকে সফলতার বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার পেছনে কাজ করেছে একঝাঁক নিঃস্বার্থ কারিগর। তাঁরা আর কেউ নন আমাদের বাংলা বিভাগের সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ। তাঁদের সুনিপুণ পরিকল্পনা, দিনরাতের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং পরম মায়াময় অভিভাবকত্ব ছাড়া এই ঐতিহাসিক সফর কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি দর্শনীয় স্থানে সবাইকে সুশৃঙ্খলভাবে আগলে রাখার কঠিন দায়িত্বটি শিক্ষকেরা পরম যত্নে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। নিজেরা সব কষ্ট ভুলে, মুখে ক্লান্তির লেশমাত্র না রেখে পুরোটা পথ তাঁরা ছাত্রীদের জুগিয়েছেন অফুরন্ত অনুপ্রেরণা ও আনন্দ। কুয়াশা আর রোদের লুকোচুরি মাড়িয়ে শিক্ষকদের সুশৃঙ্খল নির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা যখন নূরজাহান টি স্টেটে পৌঁছায়, তখন চারদিকে শুধু সবুজের সমারোহ। দিগন্তজোড়া চায়ের বাগান যেন সবুজ মখমলের গালিচা বিছিয়ে স্বাগত জানাল ইডেনিয়ানদের। দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশে ছাত্রীরা মেতে উঠেছিল ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হতে। সাহিত্যের ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির এই বিশাল পাঠশালায়, প্রিয় শিক্ষাগুরুদের পরম সান্নিধ্যে এসে এক অদ্ভুত আত্মিক প্রশান্তি ছুঁয়ে গিয়েছিল সবাইকে। পরবর্তী গন্তব্য ছিল মাধবপুর লেক। চারদিকে উঁচু-নিচু পাহাড়, আর তার ঠিক মাঝখানে শান্ত, টলটলে জলের এক বিশাল জলাধার। লেকের জলে ফুটে থাকা নীল পদ্ম যেন একেকটি রূপক কবিতার মতো ভেসে ছিল।স্যার-ম্যামদের কড়া নজরদারি আর নিরাপদ ছত্রছায়ায় পাহাড়ের বুক চিরে লেকের পাড় ধরে যখন ১৭৬ জন শিক্ষার্থীর দীর্ঘ সারি হেঁটে যাচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল সবুজের বুকে একঝাঁক সাহিত্যিকরা হেঁটে চলছে। জলের আয়নায় আকাশের প্রতিচ্ছবি আর চারপাশের নিস্তব্ধতা সবার মনে এনে দিয়েছিল এক অপার্থিব সাহিত্যিক ভাবুকতা।বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতি আর্কাইভে যখন পুরো দল পৌঁছাল, তখন ইতিহাসের সেই বীরত্বগাথা পরিবেশে নেমে আসে এক গম্ভীর নীরবতা। ১৯৭১ সালের তরুণ হামিদুর রহমানের অসীম আত্মত্যাগ আর মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার গল্প যেন দেয়ালগুলো থেকে ফিসফিসিয়ে কথা বলছিল। এই আর্কাইভ দর্শন আমাদেরকে কেবল অতীত ইতিহাসই স্মরণ করায়নি, বরং দেশপ্রেমের চেতনায় সমৃদ্ধ করেছে। ভ্রমণের ক্লান্তিতে যখন বিকেলের ছায়া নামছিল, তখন সবার ক্লান্তি দূর করতে হাজির হলো শ্রীমঙ্গলের অন্যতম বিস্ময়-নীলকণ্ঠ টি কেবিনের বিখ্যাত সাত রঙের চা। কাঁচের গ্লাসে এক একটি স্তরে সাজানো ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের চা যেন জীবনেরই হরেক রঙের প্রতীক। সবাই একসাথে বসে চায়ে চুমুক দেওয়া সেই মেদহীন আড্ডা, প্রাণখোলা হাসি আর খুনসুটি যেন এই শিক্ষাসফরের সমাপনী টানল এক মধুর তৃপ্তিতে। দিনশেষে যখন ঢাকার উদ্দেশ্যে বাসগুলো রওনা দিল, তখন সবার চোখেমুখে ক্লান্তির চেয়ে বেশি ছিল এক অদ্ভুত প্রাপ্তির আনন্দ। ১৭৬ জন শিক্ষার্থীর এই বিশাল সমাগমকে পরম মায়া, স্নেহ আর নিখুঁত শৃঙ্খলায় আগলে রেখে ইডেন কলেজের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক তৈরি করে দিলেন বাংলা বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ। প্রকৃতির বুক থেকে সাহিত্যের রসদ নিয়ে, গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ছুঁয়ে আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অটুট বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে ইডেনের বাংলা বিভাগের এই শ্রীমঙ্গল সফর চিরকাল স্মৃতির অ্যালবামে অম্লান ও ভাস্বর হয়ে থাকবে।
লেখক পরিচিতিঃ-
নামঃ মিথিলা জসিম তন্নি
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ,ঢাকা।
মোবাইলঃ 01614510294
ইমেইলঃ mithilajasim@gmail.com
