যে শ্রমের মজুরি নেই, তার মূল্য কত?
যে শ্রমের মজুরি নেই,তার মূল্য কত?
সকাল থেকে রাত-একজন মা রান্না করছেন, শিশুকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন, বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ির ওষুধ দিচ্ছেন, ঘর গোছাচ্ছেন। দিন শেষে তাঁর হাতে কোনো বেতন নেই, নেই নিয়োগপত্রও। অর্থনীতির প্রচলিত হিসাবে তাঁর এই শ্রমের মূল্যও প্রায় অদৃশ্য। অথচ এই শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই পরিবারের অন্য সদস্যরা কর্মস্থলে যেতে পারেন, শিশুরা স্কুলে যেতে পারে, একজন অসুস্থ মানুষ সুস্থ হয়ে আবার কাজে ফিরতে পারেন। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে-যে শ্রম অন্য সবার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখে, সেই শ্রম নিজেই অর্থনীতির বাইরে থাকবে কেন? বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২১ সালের সময় ব্যবহার জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি অবৈতনিক যত্ন ও গৃহস্থালি কাজ করেন-এই বৈষম্যকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক আলোচনায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাও তুলে ধরেছে। এই সংখ্যাটি শুধু নারী-পুরুষের কাজের পার্থক্য বোঝায় না,এটি দেশের অর্থনীতিতে একটি অদৃশ্য কাঠামোগত সমস্যারও ইঙ্গিত দেয়। কারণ একজন নারী যখন দীর্ঘ সময় অবৈতনিক যত্নের কাজে ব্যয় করেন, তখন তাঁর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, চাকরি বা ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সময় ও সুযোগ কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের চিত্রও এ বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাভিত্তিক সাম্প্রতিক হিসাবে ২০২৪ সালে ১৫–৬৪ বছর বয়সী নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ছিল প্রায় ৩৮.৭ শতাংশ,একই বয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৮০.৬ শতাংশ। অবশ্য নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কম হওয়ার একমাত্র কারণ যত্নের দায়িত্ব নয়। শিক্ষা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পরিবহন, সামাজিক রীতি, মজুরি, কর্মসংস্থানের ধরনসহ বহু বিষয় এখানে কাজ করে। তবে অবৈতনিক যত্নের অসম বোঝা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
আমরা সাধারণত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বলতে পণ্য উৎপাদন, ব্যবসা, চাকরি কিংবা সেবা খাতকে বুঝি। কিন্তু একজন মানুষ যেন এসব কাজে অংশ নিতে পারেন, তার পেছনে প্রয়োজন হয় খাবার, পরিচর্যা, সন্তান পালন, অসুস্থতার সময় সহায়তা এবং দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার নানা কাজ। অর্থাৎ যত্নের কাজ উৎপাদনশীল অর্থনীতির বাইরে নয় বরং সেটিকে সম্ভব করে তোলার অন্যতম ভিত্তি। একজন কর্মজীবী মা যদি সন্তানকে রাখার নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ব্যবস্থা না পান, তাহলে তাঁকে চাকরি ছেড়ে দিতে হতে পারে। ফলে কেয়ার বা যত্নের অবকাঠামোর ঘাটতি শেষ পর্যন্ত শ্রমবাজার, পারিবারিক আয় ও জাতীয় উৎপাদনশীলতায় প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বাংলাদেশবিষয়ক ‘কর্মক্ষেত্রে যত্ন’ শীর্ষক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, যত্নের নীতি ও সেবা শক্তিশালী করা নারীর শ্রমবাজারে প্রবেশ ও টিকে থাকার বাধা কমাতে পারে।
পার্পল ইকোনমিকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিতে হলে শুধু সচেতনতার কথা বললে হবে না, প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য উদ্যোগ। সবচেয়ে জরুরি সাশ্রয়ী ও মানসম্মত শিশুযত্নসেবা সম্প্রসার-শুধু বড় করপোরেট অফিসে ডে-কেয়ার চালু করলেই হবে না, শিল্পাঞ্চল, সরকারি অফিস, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় বাজারকেন্দ্রিক এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে কমিউনিটি ডে-কেয়ার সেন্টার তৈরি করা যেতে পারে। ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একটি গবেষণায় বাংলাদেশে কর্মজীবী অভিভাবকদের ৫৪ শতাংশ বলেছেন, সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী শিশুযত্নসেবার অভাব নারীর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ ও টিকে থাকার বড় বাধা। সমান গুরুত্বপূর্ণ পিতৃত্বকালীন ছুটিকে কার্যকর করা-সন্তান জন্মের পর যত্নের দায়িত্ব শুধু মায়ের ওপর রাখলে কর্মক্ষেত্রে নারীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়, বাবার জন্য পর্যাপ্ত ও ব্যবহারযোগ্য ছুটি চালু করলে শিশুর যত্ন পারিবারিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এর পাশাপাশি নমনীয় কর্মঘণ্টা, শিফট পরিবর্তনের সুযোগ, আংশিক দূরবর্তী কাজ এবং প্রয়োজনভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি পারিবারিক ছুটির ব্যবস্থাও সন্তান বা নির্ভরশীল সদস্য থাকা কর্মীদের চাকরি ধরে রাখা সহজ করবে।
এসবের পাশাপাশি কেয়ার ওয়ার্কারদের পেশাগত স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি-শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের যত্নে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা সনদ চালু করে তরুণ নারী-পুরুষদের প্রশিক্ষিত কেয়ার ওয়ার্কার হিসেবে গড়ে তোলা যায়। অবৈতনিক শ্রমের নিয়মিত তথ্য সংগ্রহও দরকার-সময় ব্যবহার জরিপের ধারাবাহিকতা রেখে সেই তথ্য জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেটে ব্যবহার করা প্রয়োজন, কারণ যে শ্রমের তথ্য নেই তার জন্য কার্যকর নীতি তৈরিও কঠিন। আর ইউনিয়ন-উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশীদারত্বে পরীক্ষামূলক কমিউনিটি কেয়ার সেন্টার চালু করা গেলে পুরো ব্যয়ভার সরকারের ওপর পড়বে না। কেয়ার সেবায় বিনিয়োগকে সামাজিক ব্যয় নয়, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা। একটি ভালো ডে-কেয়ার শুধু একটি শিশুকে দেখাশোনা করে না, একজন মাকে কর্মক্ষেত্রে থাকার সুযোগ দেয়; একজন প্রশিক্ষিত কেয়ার ওয়ার্কার শুধু একজন প্রবীণের সেবা করেন না, পরিবারের অন্য একজন সদস্যকেও কাজ করার সময় করে দেন।
পার্পল ইকোনমির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই। যত্নের কাজ নারীর স্বাভাবিক দায়িত্ব-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সন্তান পালন, রান্না, ঘর পরিষ্কার কিংবা পরিবারের প্রবীণ সদস্যের যত্ন কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গের কাজ নয়, এগুলো পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের মূল্য স্বীকার করার অর্থ প্রতিটি কাজের জন্য সরাসরি বেতন দেওয়ার দাবি নয়-বরং এই শ্রমের অস্তিত্বকে নীতিতে স্বীকৃতি দেওয়া, এর বোঝা কমানো, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া এবং যাঁরা পেশাগতভাবে কেয়ার সেবা দেন তাঁদের ন্যায্য মজুরি ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা আমরা বহু বছর ধরে বলছি। কিন্তু কাজের সুযোগ তুলে দেওয়ার পাশাপাশি নারীর ওপর থাকা অদৃশ্য যত্নের বোঝা না কমালে সেই অংশগ্রহণ টেকসই হবে না। অর্থনীতির প্রচলিত হিসাব আমাদের বলে-কে কত আয় করেছে, কত পণ্য উৎপাদন হয়েছে, কত বিনিয়োগ এসেছে। পার্পল ইকোনমি আমাদের আরেকটি প্রশ্ন করতে শেখায়-এই উৎপাদনের পেছনে যত্নের কত শ্রম ছিল? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি শুধু কারখানা, প্রযুক্তি বা বিনিয়োগের ওপর দাঁড়াবে না, দাঁড়াবে মানুষের সক্ষমতার ওপরও-আর সেই সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যত্নের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে
দৈনিক প্রতিদিনের সংবাদ
পত্রিকায় প্রকাশিত।
