ভেজালের বাজারে অনিরাপদ ভোক্তা
একসময় বলা হতো, “স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।” কিন্তু আজকের বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে-যে খাদ্য আমাদের সুস্থ রাখার কথা, সেটিই যদি নীরব বিষে পরিণত হয়, তবে সুস্থতার নিশ্চয়তা কোথায়? ভেজাল খাদ্য আজ শুধু একটি ভোক্তা অধিকার-সংক্রান্ত সমস্যা নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জাতীয় সংকট। প্রতিদিন আমরা যে চাল, ডাল, তেল, মসলা, দুধ, ফল, মাছ কিংবা মিষ্টি কিনছি, তার কতটুকু নিরাপদ-এই প্রশ্নের উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (BFSA) ২০২৪–২৫ অর্থবছরের পরীক্ষায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত ১,৭১৩টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ৫৭১টি, অর্থাৎ প্রায় ৩৩ শতাংশ ভেজাল, দূষিত অথবা মানসম্মত নয়। পরীক্ষায় আচার, সস, চিপস, ফলের পানীয়, সরিষার তেল, ভোজ্যতেল, মধুসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে সমস্যা ধরা পড়েছে। এই চিত্র প্রমাণ করে ভেজাল খাদ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। বাজারে ভেজালের ধরনও দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। ফল দ্রুত পাকাতে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক, মসলায় শিল্পকারখানার রং, দুধে পানি, স্টার্চ বা ডিটারজেন্ট, মধুতে কৃত্রিম সিরাপ, ভোজ্যতেলে নিম্নমানের তেল মেশানোর মতো অনৈতিক কর্মকাণ্ড এখনও উদ্বেগের কারণ। এসব ভেজালের উদ্দেশ্য কম খরচে বেশি মুনাফা। ভেজাল খাদ্যের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে সব সময় বোঝা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে এটি ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। চিকিৎসকদের মতে, নিয়মিত ভেজাল খাদ্য গ্রহণে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, বমি, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, লিভারের ক্ষতি, কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস, হৃদ্রোগ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। অপুষ্টি, শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং মেধার বিকাশে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। গর্ভবতী নারীদের জন্যও ভেজাল খাদ্য মা ও গর্ভস্থ শিশুর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এত আইন ও প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কেন এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না? এর অন্যতম কারণ অতিরিক্ত মুনাফার লোভ, দুর্বল তদারকি, পর্যাপ্ত পরীক্ষাগারের অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতার ঘাটতি। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলেও তা প্রায়ই মৌসুমি উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীদের একটি অংশ আবারও একই অপরাধে ফিরে আসে। নিরাপদ খাদ্য আইনে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনের বিরুদ্ধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে । কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ অভিযান শেষ হয় ভ্রাম্যমাণ আদালতের হাতে-যেখানে জরিমানা আদায় হয় পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ টাকার মধ্যে, কারাদণ্ড কার্যকর হওয়ার নজির হাতে গোনা। অর্থাৎ কাগজে-কলমে আইন যতটা কঠোর, প্রয়োগের বাস্তবতা ততটাই নমনীয়-আর এই ফাঁকটাই ভেজালকারীদের বারবার ফিরে আসার সাহস জোগায়। ভেজাল খাদ্যের মূল্য শুধু স্বাস্থ্যে পরিশোধ হয় না, অর্থনীতিতেও তার বিল আসে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো মিলে প্রতি বছর হারায় ১১ হাজার কোটি ডলার-যার বেশিরভাগ আসে অসুস্থতার কারণে কর্মক্ষমতা হ্রাস থেকে, বাকিটা সরাসরি চিকিৎসা ব্যয়ে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী এই সংস্থার প্রধান দায়িত্বই হলো খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত সকল সংস্থার কার্যক্রম সমন্বয় করা।যা থেকেই বোঝা যায়, সমন্বয়হীনতা কতটা কাঠামোগত সমস্যা। বিএসটিআই মান নির্ধারণ করে, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ তদারকি করে, আবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও একই বাজারে অভিযান চালায়।
তবে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সাম্প্রতিক সময়ে বাজার তদারকি, মোবাইল কোর্ট, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করেছে। এছাড়া দেশের ৬৪ জেলায় দেশব্যাপী মোবাইল ল্যাবের মাধ্যমে খাদ্য পরীক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ী, উৎপাদক এবং ভোক্তা সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ব্যবসায়ীদের বুঝতে হবে, সাময়িক লাভের জন্য মানুষের জীবন নিয়ে খেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যদিকে ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। খাদ্য কেনার সময় উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং মোড়কের তথ্য যাচাই করা উচিত। বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কেনা, মৌসুমি ফল ও শাকসবজি খাওয়া, ফল-সবজি ভালোভাবে ধুয়ে ব্যবহার করা, খোলা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের খাবার এড়িয়ে চলা এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে বাসায় রান্না করা তাজা খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনগুলোরও ভূমিকা বাড়াতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। ভোক্তারা যেন সহজে অভিযোগ জানাতে পারেন এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সে ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করতে হবে। কঠোর আইন, স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা, নৈতিক ব্যবসায়িক চর্চা এবং সচেতন নাগরিক-এই চারটি বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখা উচিত। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যতটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, ততটাই প্রতিটি নাগরিকের সচেতন অংশগ্রহণেরও বিষয়।