বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

ঢাবিতে কোকা-কোলার ব্যানার: নৈতিকতার মানদণ্ডে কিছু প্রশ্ন

Author

মোঃ সিফাতুল্লাহ তাসনীম , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ২১১ বার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নানান প্রোগ্রামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যানার বা ফেস্টুন ঝুলে থাকা হয়তো সাধারণ দৃশ্য। কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান শিক্ষামূলক কোনো আয়োজনের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করছে—এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু যখন সেই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে একটি চলমান বৈশ্বিক মানবিক ও নৈতিক বিতর্ক রয়েছে, তখন প্রশ্নটি আর কেবল একটি কোমল পানীয়ের বোতল কিংবা একটি বিজ্ঞাপনের ব্যানারে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন প্রশ্ন জাগে বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সকলের সামগ্রিক নৈতিক অবস্থান নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোকা-কোলার পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচারণার ঘটনা তাই আমার কাছে নিছক একটি বাণিজ্যিক অংশীদারত্বের (Corporate partnership) বিষয় নয়। এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক ভাবমূর্তি এবং সচেতন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নৈতিক অবস্থানের জায়গাতে একটি অসঙ্গতির প্রশ্ন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের মানুষের অধিকার, ইসরায়েলি দখলদারিত্ব এবং গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মতো বাংলাদেশেও কোকা-কোলাসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে বয়কট আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এমন বাস্তবতায় সেই একই কোকা-কোলা যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচারণার মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়, তাহলে একজন সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক।

প্রথমে দেখা যাক, কোকা-কোলা ও ইসরায়েলের সম্পর্কের জায়গাটি কোথায়?

কোকা-কোলা কোম্পানি নিজেরা দাবি করে যে, তারা ইসরায়েলকে কোনো অনুদান দেয় না কিংবা তারা তাদের আয়ের কোনো নির্দিষ্ট অংশ ইসরায়েল সরকার বা সামরিক বাহিনীকে প্রদান করে—এমন দাবিও অস্বীকার করে। কোকা-কোলাকে সরাসরি ইসরায়েলি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও আমি বলছি না; বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শেয়ার-বাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এখানেই পুরো ব্যাপারটি শেষ হয়ে যায় না! ফিলিস্তিনভিত্তিক বয়কট, বিনিয়োগ প্রত্যাহার ও নিষেধাজ্ঞা আন্দোলন, বিডিএস (Palestinian Boycott, Divestment and S Movement—BDS) কোকা-কোলার ইসরায়েল-সংযোগ নিয়ে ভিন্ন একটি অভিযোগ সামনে এনেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোকা-কোলার ইসরায়েলি পরিবেশক প্রতিষ্ঠান—সেন্ট্রাল বেভারেজ কোম্পানি (Central Beverage Company)। অর্থাৎ কোকা-কোলা ‘Israel-Atarot Settlement Industrial Zone’-এ একটি আঞ্চলিক পণ্য বিতরণ কেন্দ্র (Regional distribution Centre) ও কুলিং হাউজ (Cooling houses) পরিচালনা করে। দখলদার ইসরাইলে কোকা-কোলা কোম্পানির এই বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে BDS ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ ব্যবস্থা (Settlement System)- এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা (Corporate Involvement) হিসেবে দেখে এবং এই জন্য তারা কোকা-কোলা বর্জনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সচেতন মহলের কাছে আমার প্রশ্ন, ইসরায়েলি বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্ব-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক থাকলে, সেই সম্পর্ককে আমরা নৈতিকভাবে কীভাবে মূল্যায়ন করব? ইতিবাচক নাকি নেতিবাচকভাবে?

এবার আসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামে কোকা-কোলার ফান্ডিংয়ের বিষয়ে। প্রথমত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা নয়; এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক পরিসর। এখানকার শিক্ষার্থীরা দখলদারী ব্যবস্থার সাথে জড়িত কারো অর্থের কাঙাল নয়। তারা সমাজ, রাষ্ট্রের অন্যায় নিয়ে ভাবে এবং প্রশ্ন তোলে, তারা রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে কথা বলে এবং আন্তর্জাতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে বরাবরই অবস্থান নেয়। ফিলিস্তিনের প্রশ্নেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সোচ্চার অবস্থান নতুন কোনো বিষয় নয়। তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে যখন এমন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা দেখা যায়, যার ইসরায়েল-সংযোগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বয়কটের আহ্বান রয়েছে, তখন প্রশ্ন তোলাটা কি অযৌক্তিক? না! বরং আমি মনে করি, এটিই একজন সচেতন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক ও নৈতিক দায়িত্ব।

একজন ব্যক্তি কোনো পণ্য কিনবেন কি কিনবেন না, সেটি তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষককে (Corporate Sponsor) তার নিজস্ব পরিসরে অনুষ্ঠান এবং প্রচারণার সুযোগ দিবে কি না সেটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিক সিদ্ধান্ত (Institutional Ethical Decision)। আমরা প্রায়ই পৃষ্ঠপোষকতাকে একটি স্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন হিসেবে দেখে থাকি। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অর্থ দেবে, ফান্ডিং করবে, তার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানের প্রতীক, লোগো থাকবে, ব্যানার থাকবে, প্রচারণা থাকবে—ব্যস, হিসাব শেষ! কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে হিসাবটা এত সরল নয়। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় হলো, মূল্যবোধ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান (Value-Producing institution)। তাই কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ গ্রহণের আগে অন্তত একটি প্রশ্ন থাকা উচিত যে, ‘এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল্যবোধের কোনো সংঘাত আছে কি না?’

যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ঊনসত্তর-নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, চব্বিশের কোটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও গণঅভ্যূত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের মূল্যবোধ সবসময় দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে যখন কোনো কোম্পানি বা তার আঞ্চলিক কার্যক্রমকে ঘিরে মানবাধিকার ও দখলদারিত্বের মতো গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন ওঠে, তখন তাদের পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণের আগে একটি স্বচ্ছ নৈতিক যাচাই প্রক্রিয়া (Ethical Screening) থাকাটা কি কাম্য নয়!

একদিকে আমরা ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে রাজুতে দাঁড়াই, গাজার শিশুদের ছবি দেখে ক্ষুব্ধ হই, ব্যথিত হই, ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মিছিল করি, অন্যদিকে একই সময়ে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে সেই ব্র্যান্ডের বাণিজ্যিক উপস্থিতিকে স্বাভাবিক করে ফেলা হচ্ছে! এই দ্বৈততা সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা মেনে নিতে পারি না। ইসরায়েল-কোকাকোলা বিতর্কটি বাস্তব এবং নৈতিকতার জায়গাতে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন বা দ্বিধার ক্ষেত্রটিও বাস্তব।

আমার প্রশ্ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি তার বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো নৈতিক যাচাইপ্রক্রিয়া অনুসরণ করে? যদি করে থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার, দখলদারিত্ব, যুদ্ধ, পরিবেশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়? আর যদি এমন কোনো প্রক্রিয়া না থাকে, তাহলে এখনই সময় সেটি নিয়ে ভাববার। কারণ, আজকে যদি আমরা ঢাবি ক্যাম্পাসে কোকা-কোলার স্পন্সরশিপের স্বাভাবিকীকরণ (Normalization) নিয়ে সচেতন না হই, তাহলে পরবর্তীতে হয়তো কোকা-কোলা কোম্পানি পুনরায় তাদের অর্থের লোভের ফাঁদে ফেলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্থিক ও ব্র্যান্ডিংয়ের ফায়দা নিবে এবং এক সময় এটা স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমি মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং এর শিক্ষার্থীরা কোকা-কোলার অর্থ সাহায্যের মুখাপেক্ষী নয়!

কেউ হয়তো বলতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয় তো রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান; তাহলে কোনো ব্র্যান্ডকে কেন বাদ দিতে হবে? কিন্তু নিরপেক্ষতা আর নৈতিক উদাসীনতা এক জিনিস নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে না-ও থাকতে পারে; কিন্তু মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, দখলদারিত্ব, নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্নে তার একটি নৈতিক বিবেচনা শিক্ষার মৌলিক মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত। বরং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হলো, সে অর্থের বিনিময়ে নিজের বিবেক বিক্রি করবে না!

পরিশেষে, আমার আপত্তি একটি কোমল পানীয়ের ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে নয়। আমার প্রশ্ন হলো, আমরা কোন পৃথিবীকে স্বাভাবিক করে তুলতে চাই? যে পৃথিবীতে গাজার শিশুর কান্না আমাদের প্রতিবাদের কারণ হবে, কিন্তু সেই একই মানবিক সংকটের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিতর্কিত একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আমাদের ক্যাম্পাসে নির্বিঘ্নে প্রচারণা চালাবে— এই দ্বৈততা কি আমরা মেনে নেব? আমি মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং ভবিষ্যতে কোনো বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণের আগে একটি স্বচ্ছ, প্রকাশ্য ও নৈতিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ব্যানারে শুধু বিজ্ঞাপন ঝোলে না; সেখানে আমাদের মূল্যবোধও জড়িত থাকে!

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।