মানবিকতার আড়ালে নিত্য-প্রতারণা: বিশ্বাসের সংকটে আমাদের রাজধানী
রাজধানী ঢাকা যেন এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কারখানা! এই নগরীর ব্যস্ত ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাবার সময় কিংবা জ্যামে আটকে গণপরিবহনে বসে থাকতে থাকতে সম্মূখীন হতে হয় বিচিত্র সব মানুষের! চেনা-অচেনা এই মানুষের ভিড়ে কিছু মুখ থাকে, যা খুব সহজেই আমাদের মানবিক অনুভূতির জায়গায় স্পর্শ করে। আমরা যারা সাধারণ নাগরিক, তারা প্রায়ই অপরের কষ্ট দেখে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিই এবং এটি সম্ভবত স্রষ্টাপ্রদত্ত আমাদের মানবীয় গুণ। কিন্তু সেই সহানুভূতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে যখন প্রতিনিয়ত ছদ্নবেশী সাজানো নাটকের শিকার হতে হয়, তখন সত্যিই প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আসলেই কোনো অভাবীকে সাহায্য করছি, নাকি কোনো দক্ষ প্রতারকের অভিনীত নাটকের দর্শক বনে তাদেরকে সাহায্য করছি?
সম্প্রতি এরকমই কয়েকটি ঘটনা আমাকে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।
প্রথম ঘটনাটি এক খুদে হকারের। রাস্তার পাশ দিয়ে যাবার সময় পথচারীরা দেখলো, ফুটপাতে বাদাম-বুট বিক্রি করা এক ছোট ছেলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রাস্তায় তার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাদাম আর বুটগুলোর দিকে তাকিয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে। সে জানালো, আজকের দিনের তার পুরো সম্বল নষ্ট হয়ে গেছে; খালি হাতে বাড়ি ফিরলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। এই দৃশ্য দেখে যে কারো মন গলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। পথচারীদের অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তাকে ক্ষতিপূরণ দেবার চেষ্টা করলো। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো, কয়েকদিনের ব্যবধানে তাকে অন্য একটি এলাকায় একই কায়দায় কাঁদার নাটক করতে দেখা যায়। এটি ছিল তার সুপরিকল্পিত এক অভিনয়। প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় সে এই একই নাটক সাজায় এবং সংবেদনশীল মানুষের আবেগ কাজে লাগিয়ে মুহূর্তেই হাজার টাকা পকেটস্থ করে নেয়।
দ্বিতীয় ঘটনাটি গণপরিবহনের। সিগনালে থামতেই হুট করে বাসে উঠল এক তরুণ। গায়ে তার নীল রংয়ের জুব্বা ও মাথায় আছে টুপি। চলনে-পোশাকে পুরোদস্তর যেনো একজন ধার্মিক ছেলে। খুব বিনীত গলায় সে যাত্রীদের কাছে আকুতি জানালো, সে মাদ্রাসায় পড়ে। কিন্তু তার নাকি কোরআন শরীফ কেনার টাকা নেই। তাই যে যার মতো পারে, যেন তাকে কিছু সাহায্য করে। ধর্মীয় অনুভূতির জায়গা থেকে বাসের অনেকেই পকেট থেকে টাকা বের করে দিল। অথচ একটু হিসাব করলেই বোঝা যায়, বাজারে কুরআনুল কারীমের একটি মাসহাফের দাম যেখানে হয়তো আড়াই শত বা তিনশত টাকা, সেখানে প্রতিদিন বাসে-বাসে এই ধর্মীয় অনুভূতির গল্প বিক্রি করে যে পরিমাণ অর্থ তোলা হয়, তা দিয়ে অনেকগুলো কুরআনের মাসহাফ কেনা সম্ভব। ধর্মের পবিত্র আবেগকে পুঁজি করে এই যে ভিক্ষাবৃত্তির ফাঁদ, তা শুধু প্রতারণাই নয়; চরম নৈতিক অবক্ষয়ও বটে।
তিন নম্বর দৃশ্যটি আমাদের শহরের বিভিন্ন সিগন্যাল বা মোড়গুলোর খুব চেনা চিত্র। ময়লা কিংবা ছেঁড়া পোশাক পরা কিছু শিশু ফুল বা চকোলেট বিক্রি করছে। অনাহারী চেহারা আর জীর্ণ পোশাক দেখে সাধারণ মানুষের মনে উদ্রেক হয় করুণার। ফুল বা চকোলেট কেনার বাহানায় মানুষ ওদের হাতে অতিরিক্ত টাকাও তুলে দেয়। কিন্তু এই টাকা অনেক সময় ওদের পকেটে যায় না; চলে যায় ভিক্ষাবৃত্তির সিন্ডিকেটের কাছে। তারা বাচ্চাদেরকে কাজে লাগিয়ে, মানুষের আবেগকে পুঁজি করে পণ্যের কয়েক গুণ বেশি টাকা হাতিয়ে নেয়। বাচ্চাদের অনেকের পারিবারিক অবস্থা মোটেও এতটা করুণ নয়, অনেকের ভালো বাড়ি-ঘরও রয়েছে। কিন্তু সহানুভূতির ব্যবসা সহজ দেখে কিছু অভিভাবকই ওদের এই ছদ্মবেশে রাজপথে নামিয়ে দিচ্ছে!
এই সকল তিক্ত অভিজ্ঞতা যখন একের পর এক মনের ভেতর দাগ কাটে, তখন একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে হৃদয়ে তৈরি হয় বিশ্বাসের সংকট। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হল এলাকায় এক মহিলাকে দেখলাম, যিনি উনার সন্তান-সম্ভবা অবস্থার কথা বলে ডেলিভারির খরচের জন্য টাকা চাচ্ছিলেন। পরিস্থিতিটা কিন্তু অত্যন্ত সংবেদনশীল। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আরেকজন অসহায় মায়ের পাশে দাঁড়ানোটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার মনের ভেতর তখন অতীতের সেই তিনটি তিক্ত অভিজ্ঞতা এসে ভিড় করল। মনে সংশয় জাগলো, উনি কি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছেন, নাকি এটাও এই ঢাকা শহরের আরেকটা সুবিন্যস্ত নাটকের অংশ? হতে পারে মহিলাটি আসলে অভাবী, কিন্তু মনে যে সংশয়ের উদ্রেক হলো তাও কিন্তু অযৌক্তিক নয়!
এই যে একদল প্রতারক মানবিকতা, ধর্ম এবং মানুষের সরলতাকে হাতিয়ার বানিয়ে ছদ্মবেশে আমাদের পকেট কাটছে—এদের অপরাধ কেবল অর্থ আত্মসাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এরা সমাজ থেকে ‘বিশ্বাস’ নামক পবিত্র অনুভূতিটাকে তিলে তিলে হত্যা করছে। এদের এই ধান্দাবাজির কারণে আজ সত্যিকারের অভাবী মানুষগুলো সহায় সম্বলহীন হয়েও সাহায্য পাচ্ছেন না। আবার, সাহায্য করার মতো মন-মানসিকতা থাকা সত্ত্বেও অনেক মানুষ প্রতারিত হওয়ার ভয়ে হাত গুটিয়ে নেয়। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে আমাদেরকে যেমন চোখ-কান খোলা রেখে সচেতন হতে হবে, তেমনি সমাজের সত্যিকারের অভাবী মানুষগুলোকে খুঁজে বের করে তাদেরকে সহায়তার সঠিক ব্যবস্থা করতে হবে। ভিক্ষাবৃত্তি রোধ করে মানুষকে পরিশ্রম করে উপার্জন করার শিক্ষা দিতে হবে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।
শহরের অলিতে-গলিতে ছদ্নবেশী প্রতারকদের প্রকৃত বাস্তবতার উন্মোচন না হলে এই শহরের মানবিকতা হয়তো একদিন পুরোপুরি নির্বাসনে চলে যাবে! প্রতারকদের অসহায়ত্বের নাটকে আড়ালে চাপা পড়ে যাবে হাজারো ক্ষুধার্ত, অনাহারী মানুষের গল্প। এই সংকট থেকে উত্তরণে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিকল্প নেই।
