নবায়নযোগ্য জ্বালানি
https://epaper.protidinerbangladesh.com/second-edition/2026-08-08/4/1582/detail
নবায়নযোগ্য জ্বালানি
জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট বিশ্বকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। একসময় যে দেশগুলো তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভর করেই উন্নয়নের পথ খুঁজেছে, তারাও এখন সৌর, বায়ু, জল ও বায়োমাসভিত্তিক জ্বালানিকে ভবিষ্যতের প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। দ্রুত শিল্পায়ন, নগরায়ণ, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কিন্তু দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ দ্রুত কমে আসছে এবং আমদানিকৃত এলএনজি, তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার একটি উদ্যোগ নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান শর্ত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামীণ অঞ্চলের প্রায় ২ কোটিরও বেশি মানুষ প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের সুবিধা পেয়েছে। বিদ্যুতের আলো পৌঁছানোর ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ বেড়েছে, স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতি হয়েছে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। এটি প্রমাণ করে যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেবল বিদ্যুৎ সরবরাহ করে না; এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সৌরশক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুশক্তিরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কক্সবাজার, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, ভোলা, পটুয়াখালী এবং সেন্টমার্টিন উপকূলীয় এলাকায় বায়ুর গতি তুলনামূলক বেশি। স্রেডার বিভিন্ন সমীক্ষায় এসব অঞ্চলকে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রথমত, সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি। দ্বিতীয়ত, উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ প্রকৌশলীর ঘাটতি রয়েছে। তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের জন্য আধুনিক ব্যাটারি ও স্টোরেজ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ ছাড়া বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া কঠিন। বিশ্বব্যাংক উল্লেখ করেছে, এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বৃদ্ধি, সহজ ঋণ সুবিধা, গবেষণায় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমরা মনে করি, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে বায়ুদূষণ কমবে, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের জন্য কেবল বিদ্যুতের বিকল্প উৎস নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
