রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

কার্বলিক অ্যাসিডের বোতলে কি সত্যিই সাপ পালায়?

Author

মাসফিকুল হাসান , বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ২১ বার

বাড়ির চারপাশে কিংবা ভবনের প্রবেশপথে ছোট ছোট বোতল। কোনোটি দেয়ালের কোণে, কোনোটি সিঁড়ির পাশে, আবার কোনোটি বাগানের আশপাশে। বোতলের ভেতরে রাখা হয়েছে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ। প্রচলিত বিশ্বাস, এর গন্ধে নাকি সাপ কাছে আসে না। কোথাও কোথাও এটিকে সাপ মারার উপায় হিসেবেও মনে করা হয়। রাসায়নিকটির নাম কার্বলিক অ্যাসিড। বৈজ্ঞানিক নাম ফেনল। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় সাপের উপদ্রব ঠেকাতে কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহারের ধারণা প্রচলিত। বিশেষ করে বর্ষাকালে সাপ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়লে এমন ব্যবস্থার কথাও শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বোতলে কার্বলিক অ্যাসিড রাখলেই কি সত্যিই সাপ দূরে থাকে? নাকি নিরাপত্তার আশায় আমরা এমন এক বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে আছি, যার পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই?

 

সাপকে ঘিরে মানুষের ভয় বহু পুরোনো। গ্রামবাংলার লোককথা, পারিবারিক অভিজ্ঞতা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা নানা ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই প্রাণীটি। কেউ মনে করেন, বিশেষ কোনো গন্ধে সাপ পালিয়ে যায়। কেউ বিশ্বাস করেন, নির্দিষ্ট কিছু বস্তু বাড়ির চারপাশে রাখলে সাপ আর প্রবেশ করে না। এসব ধারণার একটি হলো কার্বলিক অ্যাসিডের ব্যবহার।

এ ধরনের বিশ্বাস টিকে থাকার পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। কোনো বাড়িতে কার্বলিক অ্যাসিডের বোতল রাখার পর দীর্ঘদিন সাপ দেখা না গেলে অনেকেই ধরে নেন, রাসায়নিকটির কারণেই সাপ আসেনি। অথচ সাপ না দেখার পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। আশপাশে সাপের উপস্থিতি কম থাকা, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা সেখানে সাপের আশ্রয় ও খাবারের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকা—সবই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা।শুধু দুটি ঘটনা পাশাপাশি ঘটলেই একটিকে অন্যটির কারণ বলা যায় না। এখানেই লোকবিশ্বাস ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের পার্থক্য।

 

কার্বলিক অ্যাসিড বা ফেনল একটি পরিচিত রাসায়নিক যৌগ। শিল্পক্ষেত্রসহ বিভিন্ন নিয়ন্ত্রিত কাজে এর ব্যবহার রয়েছে। এটি বিষাক্তও বটে। তবে বিষাক্ত হওয়া এবং সাপ প্রতিরোধে কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। কার্বলিক অ্যাসিডের বোতল বাড়ির চারপাশে রাখলে সাপ প্রবেশ করবে না—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। একইভাবে বোতলে পদার্থটি রেখে দেওয়াকে সাপ মারার নিশ্চিত পদ্ধতি বলারও ভিত্তি নেই। সাপ তার আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতে বিভিন্ন সংবেদনশীল অঙ্গ ব্যবহার করে। বিশেষ করে জিহ্বার সাহায্যে পরিবেশ থেকে রাসায়নিক কণা সংগ্রহ করে মুখের ভেতরের জ্যাকবসন অঙ্গের মাধ্যমে সেগুলো শনাক্ত করতে পারে। কিন্তু সাপ রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করতে পারে বলেই যেকোনো তীব্র গন্ধ তাকে নির্দিষ্ট এলাকা থেকে দূরে রাখবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। সাপের আচরণ প্রজাতি, পরিবেশ, আশ্রয়, খাদ্যের প্রাপ্যতা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ফলে একটি বোতলকে সাপের বিরুদ্ধে অদৃশ্য নিরাপত্তাবেষ্টনী মনে করা বিভ্রান্তিকর।

 

কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো মানুষের নিরাপত্তা। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথের তথ্য অনুযায়ী, ফেনলের সংস্পর্শে চোখ, ত্বক ও শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। গুরুতর সংস্পর্শে শরীরের অন্যান্য অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ যে রাসায়নিককে মানুষ নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বাড়ির আশপাশে রাখছে, সেটিই অসাবধানতায় নতুন বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে শিশু, পোষা প্রাণী কিংবা রাসায়নিকটির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ধারণা নেই—এমন ব্যক্তিদের জন্য অরক্ষিত বোতল ঝুঁকি তৈরি করে। আরেকটি সমস্যা হলো মিথ্যা নিরাপত্তাবোধ। কেউ যদি মনে করেন, কার্বলিক অ্যাসিডের বোতল রাখা আছে বলে বাড়িতে সাপ ঢোকার আশঙ্কা নেই, তাহলে তিনি হয়তো প্রকৃত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোকে গুরুত্ব দেবেন না। এমন আত্মবিশ্বাস কখনো কখনো বিপদের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

 

সাপ সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে বাড়িতে প্রবেশ করে না। খাদ্য, আশ্রয়, নিরাপদ পরিবেশ কিংবা চলাচলের পথে মানুষের বসতির কাছে চলে আসতে পারে।

বাড়ির আশপাশে ইঁদুরের উপস্থিতি, জমে থাকা আবর্জনা, অপরিচ্ছন্ন ঝোপঝাড়, নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ কিংবা বিভিন্ন ফাঁকফোকর সাপের আশ্রয়ের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বর্ষাকালে পানি বেড়ে গেলে অনেক প্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থলও পরিবর্তিত হয়। তখন মানুষের সঙ্গে সাপের অনাকাঙ্ক্ষিত মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এ কারণে সাপের উপস্থিতি কমাতে রাসায়নিকের ওপর নির্ভর না করে বসতবাড়ির পরিবেশ নিরাপদ রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বাড়ির চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা, ইঁদুরের উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা, অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জমিয়ে না রাখা এবং ভবনের অনিরাপদ ফাঁকফোকর মেরামত করা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

সাপ নিয়ে আমাদের সমাজে আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, সাপ দেখামাত্র সেটিকে মেরে ফেলতে হবে। অথচ সব সাপ বিষধর নয়। আবার সাপ প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ইঁদুরসহ অন্যান্য ছোট প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।সাপের প্রতি অযথা আতঙ্ক অনেক সময় মানুষ ও প্রাণী—উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে। সাপ দেখা গেলে সেটিকে ধরতে, আঘাত করতে কিংবা তাড়াতে গিয়ে ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে স্থানীয় বন বিভাগ বা প্রশিক্ষিত বন্য প্রাণী উদ্ধারকর্মীর সহায়তা নেওয়াই দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। সাপে কামড়ানোর ঘটনা ঘটলে প্রচলিত টোটকা কিংবা রাসায়নিকের ওপর নির্ভর না করে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে।

 

সমাজে প্রচলিত সব বিশ্বাসের জন্ম অজ্ঞতা থেকে হয় না। অনেক বিশ্বাসের পেছনে থাকে ভয়, অভিজ্ঞতা কিংবা নিরাপদ থাকার আন্তরিক চেষ্টা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নতুন জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের আলোকে সেসব বিশ্বাস যাচাই করাও জরুরি।

কার্বলিক অ্যাসিডের বোতল রাখার প্রবণতাকে তাই শুধু কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। মানুষ কেন এটি ব্যবহার করছেন, কোথা থেকে এর কার্যকারিতা সম্পর্কে জেনেছেন এবং এর সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে কতটা সচেতন—সেসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম এবং বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা রয়েছে। সাপ সম্পর্কে সঠিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। কোন পরিস্থিতিতে সাপ মানুষের বসতির কাছে আসে, কীভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত সংস্পর্শের ঝুঁকি কমানো যায় এবং সাপ দেখা গেলে কার সহায়তা নিতে হবে—এসব বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাসায়নিক পদার্থের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার যে নিজেই জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, সেটিও জানাতে হবে।

 

একটি ছোট বোতল হয়তো কাউকে মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু সেই স্বস্তি আর বাস্তব নিরাপত্তা এক নয়। সাপের ভয় থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে আমরা যেন নতুন কোনো বিপদ ঘরে ডেকে না আনি। সাপকে শত্রু ভেবে নির্বিচারে হত্যা করা যেমন সমাধান নয়, তেমনি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় এমন রাসায়নিক প্রতিরোধব্যবস্থার ওপর নির্ভর করাও নিরাপদ পথ নয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ। বাড়ির কোণে রাখা কার্বলিক অ্যাসিডের বোতলটি তাই আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি সত্যিই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করছি, নাকি নিরাপত্তার নামে একটি প্রচলিত বিশ্বাসকেই বাঁচিয়ে রাখছি?

সাপ থেকে নিরাপদ থাকার উপায় কোনো রহস্যময় বোতলে নয়; বরং সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্তে।

 

 

 

 

মাসফিকুল হাসান

শিক্ষার্থী দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ, বেগম রোকেয়া

বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর

লেখক: সহ সাংগঠনিক সম্পাদক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
এই লেখাটি ২৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।