শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

দ্রব্যমূল্যে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ

Author

জান্নাত আক্তার শিলা , ইডেন মহিলা কলেজ

প্রকাশ: ৭ অক্টোবর ২০২৬ পাঠ: ৬৯ বার

রান্নাঘরে দীর্ঘশ্বাস: দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষ
হেঁশেল বলতে রান্নাঘর নয়, একটি পরিবারের অন্নসংস্থানের কেন্দ্রকে বোঝায়। চাল, ডাল, তেল, লবণ, সবজি, মাছ-মাংসের দাম বাড়লে প্রথম ধাক্কা লাগে হেঁশেলেই। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের কাছে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি কেবল অর্থনৈতিক ঘাটতি নয়, প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াই। বাজারের ব্যাগ হাতে ঘরে ফেরা মানুষের মুখে আজ হতাশার ছাপ স্পষ্ট। যে টাকায় একসময় সপ্তাহের বাজার হতো, আজ তা দিয়ে দু-তিন দিনের বাজার করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি বলতে বোঝায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া, যার সঙ্গে মানুষের আয়ের হিসাব মেলে না। চাল, আটা, ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, ডিম ও মাছ-মাংসের মতো পণ্যের দাম বাড়লে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ প্রভাবিত হয়। তবে যাঁদের আয় সীমিত, তাঁদের জীবনে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ। কারণ তাঁদের আয়ের সিংহভাগই খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়, ফলে দামের সামান্য বৃদ্ধিও তাঁদের পুরো সংসারের মাসিক হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। আয় যেখানে প্রায় একই থাকে, খরচ সেখানে বাড়তেই থাকে। ফলে গৃহিণীকে প্রতিনিয়ত বাজেট কাটছাঁট করতে হয়। পাতের মাছ-মাংস অর্থাৎ আমিষের পরিমাণ কমে যায়, ডিম, দুধ, ফল প্রায় বিলাসিতা হয়ে ওঠে। অনেক পরিবার দিনে তিনবেলার জায়গায় দুইবেলা খেতে বাধ্য হয়, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে শুধু ভাত-ডাল বা ভর্তা দিয়ে চালায়। রান্নার তেল, গ্যাস বা জ্বালানির দাম বাড়লে রান্নার ধরণ অনেকটা পাল্টে যায়। আগে যেখানে বৈচিত্র্যময় পদ রান্না হতো, এখন সেখানে একটি তরকারিতেই পুরো পরিবারের খাওয়া মেনেজ করতে হয়। শিশু ও বয়স্কদের পুষ্টি সরবরাহে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রয়োজনীয় আমিষ ও ভিটামিনের অভাবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়, ফলে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। খাবারের পেছনে বেশি খরচ হওয়ায় সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও সঞ্চয়ের টাকা কমে যায়। অনেক সময় অসুস্থ হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায় না। ঋণের বোঝা বাড়ে, কেউ কেউ দোকানে বাকিতে সংসার চালাতে বাধ্য হয়। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের পাশাপাশি দিনমজুর, রিকশাচালক ও ক্ষুদ্র চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বিপদে পড়েন। মধ্যবিত্তরা না পারেন লাইনে দাঁড়িয়ে কম মূল্যে টিসিবির পণ্য কিনতে, না পারেন কারও কাছে ধার নিতে এই নীরব কান্না ও দীর্ঘশ্বাস এখন ঘরে ঘরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এর তথ্যানুযায়ী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.৭১ শতাংশে উঠেছিল, নভেম্বরে যা ছিল ৭.৩৬ শতাংশ। ২০২৬ সালের জুনে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬০ শতাংশ, যা একবছরে বেড়েছে প্রায় ১.২ শতাংশ। এমনকি টিসিবির ট্রাকেও চাল, তেল ও চিনির দাম বাড়ে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ দায়ী। প্রথমত, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সিন্ডিকেটের তৈরি কৃত্রিম সংকট। কিছু অসাধু মজুতদাররা পণ্য গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত, আমদানি নির্ভরতা। ভোজ্যতেল, চিনি, ডালসহ অনেক পণ্যের জন্য আমাদের দেশ অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল, ফলে ডলারের বিনিময় মূল্য ও আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা সরাসরি দেশের বাজারে প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, জ্বালানির দাম ও পরিবহন খরচ বাড়লে পণ্যের দামও বাড়ে। চতুর্থত, বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে উৎপাদন কমে যায়। পঞ্চমত, মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিক্য যার ফলে কৃষক ন্যায্য দাম পায় না অথচ ভোক্তাকে বেশি দামে কিনতে হয়। সর্বোপরি, বাজার তদারকির অভাব ও দুর্বল প্রয়োগ পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। এই সংকট থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত ও কঠোর পদক্ষেপ। দ্রব্যমূল্যের দাম রাতারাতি বেড়ে গেলেও পুনরায় স্বস্থির মূল্যে নিয়ে আসা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে নিন্মোক্ত ব্যবস্থাগ্রহণের মাধ্যমে নিত্য পণ্যসামগ্রীর মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা সম্ভব। প্রথমত, কঠোর বাজার মনিটরিং ও সিন্ডিকেট দমন।প্রশাসনকে নিয়মিত এবং সঠিকভাবে বাজার তদারকি করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ী ও মজুতদারদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা এবং কারাদণ্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারে যেন কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, মধ্যস্বত্বভোগী নয় বরং কৃষক ও ভোক্তার সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করা। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমিয়ে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থাগ্রহণ। কৃষক বাজার বা সমবায় গড়ে তোলা যাতে কৃষক ন্যায্য দাম পায় এবং ভোক্তাও কম দামে কিনতে পারে। তৃতীয়ত, পরিবহন চাঁদাবাজি বন্ধ করা। মহাসড়ক ও পাইকারি বাজারে, পণ্যবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি কঠোরভাবে দমন করতে হবে। পরিবহন খরচ কমলে পণ্যের খুচরা দাম উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। চতুর্থত, টিসিবির আওতা ও সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ বৃদ্ধি করা। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য টিসিবির মাধ্যমে চাল, ডাল, তেল ও পেঁয়াজ সাশ্রয়ী মূল্যে বিক্রির পরিমাণ এবং কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ওএমএস কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। পঞ্চমত, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানি নির্ভরতা হ্রাস করা। কৃষিতে ভুর্তকি, আধুনিক প্রযুক্তি, মানসম্মত বীজ, সার সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে হিমাগার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করে ফসলের অপচয় রোধ করা জরুরী। তাছাড়াও একক দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জরুরি পণ্যের আমদানির জন্য বিকল্প আন্তর্জাতিক উৎস খুঁজে রাখতে হবে। মানুষের আয় ও নিত্যপণ্যের দামের ভারসাম্য না থাকলে কোনো উন্নয়নই সাধারণ মানুষের কাছে অর্থবহ হয় না। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা কেবল অর্থনৈতিক নয়, নৈতিক ও মানবিক দায়িত্বও বটে। সরকার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা, সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা ও স্বদিচ্ছাই পারে হেঁশেলের এই সংকট কমিয়ে প্রতিটি পরিবারে স্বস্তির নিশ্চিত করতে। আর খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত না করতে পারলে দেশে পারিবারিক বিপর্যয় এর সাথে অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হবে। তাই দেশকে উন্নত, সমৃদ্ধ ও বিশ্বের সাথে একযোগে এগিয়ে চলা নিশ্চিত করতে খাবারের সরবরাহ সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। যখন দেশের প্রতিটি পরিবারের হেঁশেলে নিশ্চিন্তে হাঁড়ি চড়বে,তখনই একটি দেশ উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি পাবে।
জান্নাত আক্তার শিলা
শিক্ষার্থী ইডেন মহিলা কলেজ, রসায়ন বিভাগ।
Email:jannatshila0009@gmail.com
লেখক: সদস্য, ইডেন মহিলা কলেজ।
এই লেখাটি ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।