বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা কেন নির্যাতিত
সংখ্যার বিবেচনায় ইসলাম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। গোটা বিশ্বে ইসলাম ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি। তবে বিশ্বজুড়ে অত্যাচারিত হওয়ার দিক থেকে মুসলিমরাই অগ্রগামী। কিন্তু কেন? কেন আজ দিকে দিকে মুসলিমরা নির্যাতিত? এ বিষয়টি চিন্তা করলেই যে বিষয়গুলো অনায়াসে চলে আসে সেগুলো হলো-
ঈমানের দুর্বলতা: মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস অস্ত্র কিংবা সৈন্যসংখ্যা নয়। বরং সেটি হচ্ছে ঈমান ও আল্লাহর ওপর দৃঢ় আস্থা। ইতিহাসে বদর, খন্দক, ইয়ারমুক ও কাদিসিয়ার মতো বহু যুদ্ধে মুসলমানরা সীমিত সামর্থ্য নিয়েও অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছিল। কিন্তু আজ আমাদের অনেকের মধ্যে ঈমানের সেই দৃঢ়তা ও আল্লাহর ওপর আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
নৈতিক অবক্ষয়: মহানবী সা: ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা আল-কলম: ৪)। অথচ তার অনুসারী হয়েও আমরা আজ অনৈতিকতার গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। আর নৈতিকতা হারিয়ে ফেলা একটি জাতির ভিত্তি খুব সহজেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
মৃত্যুকে অধিক ভয় করা: যুগে যুগে মুসলিমরা ছিল মৃত্যু ভয়হীন অকুতোভয় যোদ্ধা। কাফেররা বেঁচে থাকাকে যতটা ভালোবাসতো মুসলিমরা শাহাদতকে ঠিক ততটাই ভালোবাসতো। আর এই পার্থক্যটাই প্রতিটি লড়াইয়ে মুসলমানদের কাফেরদের তুলনায় অধিক এগিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আজ আমরাও কাফেরদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অধিক বেঁচে থাকাকেই যেন জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছি।
ভোগ-বিলাসিতায় মত্ত থাকা: একটি জাতির ধ্বংসের জন্য মাত্রাহীন ভোগ-বিলাসে ডুবে থাকাই যথেষ্ট। কেননা দুনিয়াবি এ ভোগ-বিলাস মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্যকে ভুলিয়ে দেয়। আরো চাই, আরো চাই মানসিকতা তাদের ক্রমান্বয়ে ভোগের দাসে পরিণত করে। আর যে জাতি শুধু ভোগ করতে শেখে, ত্যাগ করতে ভুলে যায়, সে জাতি কখনো শক্তিশালী জাতি হিসেবে টিকে থাকতে পারে না।
ঐক্যের অভাব: বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ঐক্য যেন এক সোনার হরিণ। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যায় পর্যন্ত মুসলিম দেশগুলো আজ বহু দলে-উপদলে বিভক্ত। অথচ ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে উম্মাহর কল্যাণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে। আর বিভক্তি কখনো কল্যাণ বয়ে আনে না। এটি কেবল নিজেদেরকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেয়। এজন্যই কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনো বসে বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’
মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধকে ভুলে যাওয়া: পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, মুসলমানরা পরস্পর ভাই ভাই। এ ছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলমানরা হচ্ছে একটি দেহের মতো। আর দেহের একটি অংশ ব্যথা পেলে এই ব্যথায় যেমন সমগ্র শরীর ব্যথিত হয়, ঠিক তেমনি পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কোনো একজন মুসলমান ব্যথিত হলে সেই ব্যথায় ব্যথিত হবে গোটা মুসলিম উম্মাহ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মুসলিমরা আজ সেই ভ্রাতৃত্ববোধ ভুলে গিয়েছে। আর এজনাই তো দিকে দিকে মুসলিমরা মার খাচ্ছে, আর বাকিরা চুপ করে সেগুলো দেখছে। যেন তাদের কিছুই করার নেই।
যোগ্য নেতৃত্বের অভাব: মাঝিবিহীন নৌকা যেমন তীরে পৌঁছাতে পারে না, ঠিক তেমনি নেতৃত্ববিহীন একটি জাতি সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে না। একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সৎ, দক্ষ, দূরদর্শী ও যোগ্য নেতৃত্ব। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে সঙ্কট মোকাবেলা, ঐক্য সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষ নেতৃত্বের বড্ড অভাব।
শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে থাকা: আধুনিক বিশ্বে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস। মুসলিমরা একসময় জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে মুসলিম দেশগুলো গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিতে বহু বছর পিছিয়ে রয়েছে। আর এ পরিস্থিতির জন্য বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার দায়ও কোনো অংশে কম নয়।
মিডিয়া না থাকা: আন্তর্জাতিকভাবে জনমত গঠনে বর্তমানে মিডিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে সেই জায়গায় আমাদের অবস্থান একেবারেই দুর্বল। অমুসলিমদের নিয়ন্ত্রিত বহু প্রসিদ্ধ মিডিয়া থাকলেও মুসলিমদের নিয়ন্ত্রিত তাদের সমপর্যায়ের মিডিয়ার সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায়। ফলে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের ক্ষেত্রে আমরা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ি।
পরিকল্পনা ও দূরদৃষ্টির অভাব: কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার। কিন্তু আমরা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য সামনে না রেখে তাৎক্ষণিক লাভের দিকেই বেশি মনোযোগ দিই। ফলে সাময়িক সাফল্য এলেও দীর্ঘমেয়াদে এর জন্য আমাদের মাশুল গুনতে হয়। উপরিউক্ত পয়েন্টগুলো থেকে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে, মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থার জন্য কেবল বাইরের শত্রুরাই দায়ী নয়। এর জন্য আমাদের ভেতরকার নানাবিধ দুর্বলতাও দায়ী।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
