নিয়তি
যুদ্ধ-বিগ্রহের সাথে লেপ্টে আছে এক নাম— ‘সিরিয়া’। সিরিয়াবাসীদের জীবনযাত্রা ভিন্ন হলেও সকলের আশা এক ও অভিন্ন:
“প্রাণভরে শুধু বাঁচতে দাও।”
ঘণ্টায় আর মিনিটে দুপুর ঠিক বারোটা। সূর্যটা ঠিক মধ্যগগনে। ক্ষত-বিক্ষত দীর্ঘশ্বাসের সিরিয়ায় আহাজারির বায়ু বইছে। আদিলের শরীর হতে ঘাম ঝরছে দরদর। মালিকের বিশাল জয়তুন ক্ষেতে কাজ করে সে।
সেদিন কাজ করে ফেরার পথে সে কাছে কোথাও শুনল বোমার আওয়াজ— ‘বুম’, এরপরই চারদিকে আগুন, ছোটাছুটি। স্ত্রী আতিয়্যার কথা মনে পড়তেই তার মাথায় চিন্তার আকাশ গর্জে ওঠে৷ একছুটে গিয়ে ঘরে ঢুকে আতিয়্যাকে দেখতে পেয়ে সে কান্নামাখা চোখে আলতো চুমু এঁকে দেয় তার কপোলে। কান্নার ফোঁটাটি আতিয়্যার অধরে পড়ে প্রমাণ করে— “সব কান্না কষ্টের হয় না, কিছু কান্না হয় গহীনতম সুখেরও।”
তারা চলে আসে অন্য এক এলাকায়। নতুন সূর্য ওঠার সাথেই আদিল বের হয় কাজে, সূর্য ডুবলেই ঘরে ফেরে সে। মাঝের সময়টুকুন আতিয়্যা ছোট্ট ঘরকে সাজিয়ে, সন্ধ্যার বাতি জ্বেলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে প্রাণাধিকের। তারা জানে না তাদের প্রিয় মানুষগুলো ফিরবে কিনা। ঘুমোলে তারা জানে না এ ঘুম ভাঙবে কিনা। নাকি কোনো বুলেটের ছোঁয়ায় অথবা বোমার পরশে ঘুম ভাঙবে একেবারে হাশরে! তবুও তারা প্রাণভরে শুকরিয়া করে বাঁচে। মোনাজাতের ক্যানভাসে আল্লাহর নামটাই যে তাদের সবচাইতে বড় ভরসা। সিরিয়ার জীবনগুলো মরণের চাইতেও কঠিন, আর্তনাদ এখানে শ্বাসের চাইতেও স্পষ্ট। এভাবেই চলে তাদের সুখের জীবনযাত্রা।
বাইরে ব্যস্তভাবে পায়চারি করছে আদিল। আদিল ‘বাবা’ হতে চলেছে, আতিয়্যা আঁতুড়ঘরে, সেখানে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। কিছুক্ষণ পর নাজিবা বুড়ি বেরিয়ে এসে বলে, “বেটা, শুকরান! হালওয়া খাওয়া, তোর জমজ ছেলে হয়েছে।”
একছুটে আঁতুড়ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকে আদিল, সন্তর্পণে এগিয়ে আতিয়্যার পাশে বসে। চোখজুড়ে খোদার শুকরিয়া আর আনন্দাশ্রু। জমজ ছেলেদের আদর করে নাম রাখে ‘সাদমান’ ও ‘আদনান’।
আচমকা আওয়াজ হয়— “দ্রিম-দ্রিম-দ্রিম…”
এলাকাবাসীরা ‘বোমা’ ‘বোমা’ বলে চিৎকার করতে লাগল। আদিল দ্রুত প্রাণপণে ছুটে চলে। অবশেষে রেলস্টেশনে এসে পৌঁছায়। রেলে মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। কোনোভাবে সে তাদেরকে নিয়ে লাফ দিয়ে একটি বগিতে উঠে পড়ে। সাথে সাথে একটি বুলেট সাদমানের মাথা ছুঁয়ে বেরিয়ে যায়। তার মাথা ক্ষতগ্রস্ত হয়। নিদারুণ কষ্টটুকু বুকে চেপে আদিল বলে, “দাফন না করে তার দেহ ফেলে দিতে হবে গো আতি।”
শুনেই বুকে পাথর বিঁধে যায় আতিয়্যার। শুধু চোখ বন্ধ করে ওপর দিকে চেয়ে বলে, “হে পরওয়ারদিগার, এ কেমন অগ্নিপরীক্ষা!”
কতটা দুঃখ চেপে আতিয়্যা সাদমানকে জানালা দিয়ে ফেলে দিল, তা আতিয়্যাই জানে। আতিয়্যাকে সান্ত্বনা দেয়ার পর আদিল আদনানকে কোলে নেয়।
নিয়েই আর্তনাদ…
হায়! হায়! হায়!
দম বন্ধ হয়ে আসে,
জানালা দিয়ে সাদমানকে না ফেলে তারা আদনানকেই ফেলে দিয়েছে!!
লেখক:
জারির ইবনে কামাল
সদস্য, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা
