বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

নীল আকাশের ওপারে

Author

মিম বিনতে ইব্রাহিম , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৫৭ বার

 

 

ছোট্ট পাখিটি একাই তার ছোট্ট বাসায়। মা পাখিটি বের হয়ে গেছে অনেক আগেই। তার একটা ভাই ছিল, সেও উড়তে শিখে বিস্তীর্ণ সেই নীল আকাশে ডানা মেলে দিয়েছে। তারও খুব ইচ্ছে করছে নীল আকাশের বিশালতা উপভোগ করতে, কিন্তু সে পারছে না। খুব ভয় হচ্ছে তার। যদি উড়তে গিয়ে সে পড়ে যায়? ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। কিন্তু একাকিত্ব বরণ করে থাকতেও তার কষ্ট হচ্ছে।

বেশ কিছুদিন আগেই তার সমবয়সী ভাইটি মায়ের সঙ্গে বাসা ছেড়ে উড়ে গিয়েছিল। ফিরে এসে ভাইটি কত গল্পই না শুনিয়েছিল: দূরের সবুজ বন, নদীর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার অনুভূতি, মেঘের কাছাকাছি গিয়ে বাতাসের স্পর্শ, আর বিশাল নীল আকাশের নিচে নিজেকে একেবারে মুক্ত মনে হওয়ার কথা।
মা-ও প্রতিদিন ফিরে এসে তার সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর গল্প করত।“আজ আমি পাহাড়ের ওপাশ পর্যন্ত গিয়েছিলাম,” মা বলত। “সেখানে বাতাসটা অন্যরকম। মনে হয়, আকাশ যেন আরও বড় হয়ে গেছে।”
পাখিটি মুগ্ধ হয়ে শুনত। তার ছোট্ট চোখ দুটো আনন্দে জ্বলে উঠত। তারপর নিঃশব্দে বাসার কিনারায় এসে দাঁড়াত। নিচে তাকাত। দূরে তাকাত। তারপর আবার ভয়ে পিছিয়ে যেত।
একদিন মা বলল, “তুই কবে উড়বি?”
পাখিটি মাথা নিচু করে বলল, “জানি না মা। খুব ভয় করে।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “ভয় পাওয়া খারাপ নয়। কিন্তু ভয়ের জন্য সারাজীবন ডানা গুটিয়ে রাখা—সেটা কি ঠিক?”

পাখিটি কোনো উত্তর দিল না।
সেদিন রাতে ঝড় উঠল। বাসাটি দুলছিল। বাইরে অন্ধকার আকাশে বাতাস ছুটে বেড়াচ্ছিল। পাখিটি মায়ের শরীরের কাছে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল। হঠাৎ তার মনে হলো—এই ছোট্ট বাসাটিও তো সবসময় নিরাপদ নয়। ঝড় এলে বাসা কাঁপে। কখনো কখনো ডাল ভেঙে পড়ে। কখনো বাসা ছেড়ে অন্যত্র যেতে হয়।

তাহলে সে যে নিরাপত্তার জন্য উড়ছে না, সেই নিরাপত্তাটাই বা কতটা সত্যি?
পরদিন সকালে আকাশ ছিল একেবারে পরিষ্কার। বৃষ্টির পর নীল আকাশটা যেন আরও গভীর, আরও বিস্তৃত হয়ে উঠেছিল। সূর্যের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে বাসার ভেতরে এসে পড়েছে।
পাখিটি অনেকক্ষণ সেই আলোয় বসে রইল।

হঠাৎ তার মনে হলো সে এতদিন ধরে একটা প্রশ্নই করে এসেছে, “যদি আমি পড়ে যাই?”
কিন্তু কখনো নিজেকে জিজ্ঞেস করেনি, “যদি আমি না উড়ি?”
যদি সে কোনোদিনই উড়তে না শেখে?
যদি সারাজীবন এই ছোট্ট বাসার চার দেয়ালের মধ্যেই কাটিয়ে দেয়?
তাহলে সে কখনো জানবে না বাতাস কেমন। মেঘের নিচে উড়তে কেমন লাগে। দূরের নদীটা ওপর থেকে কেমন দেখায়। সে কখনো বুঝবে না, তার নিজের ডানার শক্তি আসলে কতখানি।
আর সবচেয়ে বড় কথা যে সে কোনোদিন জানবেই না, সে আসলে কতটা উড়তে পারত।
সেদিন প্রথমবার তার নিজের ভয়টাকে খুব ছোট মনে হলো।
সে বাসার কিনারায় এসে দাঁড়াল।নিচে তাকাল।আবার ভয় হলো।তার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
“যদি পড়ে যাই?”
তারপর নিজেকেই বলল,“পড়ে গেলে আবার উঠব। কিন্তু না উড়লে তো কোনোদিন জানবই না যে আমি উড়তে পারতাম কি না।”

সেদিন সে উড়ল না। কিন্তু প্রথমবারের মতো সে উড়তে চাইল। তার উড়ার ইচ্ছা ভয় কে কিছুটা আড়াল করে ফেলল।
পরদিনও সে বাসার কিনারায় এল। তার পরদিনও।
প্রতিদিন একটু একটু করে সে ডানা মেলতে শিখল। বাতাসের সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য মেলাতে শিখল। পড়ে যাওয়ার ভয়কে সঙ্গে নিয়েই একদিন সে সিদ্ধান্ত নিল যে, আর নয়।

সেদিন সকালে মা আর ভাই খাবারের সন্ধানে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
প্রতিদিনকার মতো আজও মা তাকে জিজ্ঞেস করলো, “আজ তুই আমাদের সঙ্গে যাবি?”

পাখিটির বুক আবার কেঁপে উঠল।কিন্তু এবার সে পিছিয়ে গেল না।সে বাসার কিনারায় উঠে দাঁড়াল।
নীল আকাশটা তার সামনে।
নিচে অগাধ শূন্যতা।পেছনে ছোট্ট, পরিচিত বাসা।
এক মুহূর্তের জন্য সে চোখ বন্ধ করল।তারপর ডানা মেলল।ঝাঁপ দিল।

প্রথম কয়েক মুহূর্তে তার শরীর বাতাসে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। ডানাগুলো ঠিকমতো কাজ করছিল না। সে নিচের দিকে নামতে লাগল।তার বুক কেঁপে উঠল,“আমি পড়ে যাচ্ছি!”
ভয় তাকে আবার গ্রাস করতে চাইল।কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সে ডানাগুলো আরও জোরে ঝাপটাল।একবার।দুবার।তিনবার।

তারপর হঠাৎ,তার শরীর আর নিচে নামল না।বাতাস তাকে ধরে ফেলেছে।পাখিটি চোখ খুলল।
সে উড়ছে!সত্যিই উড়ছে!নিচে তার ছোট্ট বাসাটি ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে। গাছগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।তার সামনে শুধু আকাশ।অসীম, নীল, মুক্ত আকাশ।সে আরও ওপরে উঠল।বাতাস তার পালক ছুঁয়ে গেল। সূর্যের আলো তার ডানায় এসে পড়ল। তার চোখে পানি এসে গেল কিন্তু তা ভয়ে নয়, আনন্দে।
সে বুঝতে পারল, এতদিন যে পতনকে সে ভয় পেয়েছিল, সেই পতনের আশঙ্কাই তাকে তার নিজের আকাশ থেকে দূরে রেখেছিল।

কিছুক্ষণ পর মা তার পাশে এসে উড়ল।ভাইটি দূর থেকে আনন্দে ডাকতে ডাকতে তার চারপাশে চক্কর দিতে লাগল।মা কিছু বলল না।শুধু একবার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে উড়ে গেল সামনে।
পাখিটিও তার পেছনে উড়ল।

আর সেই মুহূর্তে সে বুঝল যে, উড়তে শেখার আগে কেউ নিশ্চিত হতে পারে না যে সে পড়বে না। উড়তে হলে প্রথমে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাটাকেই মেনে নিতে হয়।
সেদিন থেকে নীল আকাশ আর তার কাছে ভয়ের জায়গা নয়।বরং সেটা হয়ে উঠল তার নিজের পৃথিবী।

পরিশেষে,মানুষের জীবনও অনেকটা সেই ছোট্ট পাখিটির মতো।
আমাদের প্রত্যেকের সামনে কোনো না কোনো একদিন একটি নীল আকাশ এসে দাঁড়ায়: কোনো স্বপ্নের আকাশ, কোনো নতুন পথ, কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত, কোনো অচেনা ভবিষ্যৎ। আমরা তখন ভাবি, “যদি ব্যর্থ হই?” “যদি পারি না?” “যদি সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়?”
এই প্রশ্নগুলো আমাদের ডানা গুটিয়ে দেয়।
আমরা অনিশ্চয়তা বরণ করতে ভয় পাই। পরিচিত জায়গায় থাকতে চাই। অথচ নিরাপদ বাসায় বসে থেকে কোনো পাখি কখনো আকাশের অর্থ জানতে পারে না।

ব্যর্থতার ভয় থাকবে। অনিশ্চয়তা থাকবে। কখনো হয়তো সত্যিই পড়ে যেতে হবে। কিন্তু পড়ে যাওয়া মানেই শেষ নয়। অনেক সময় পড়ে যাওয়াই আমাদের শেখায় কীভাবে আবার ডানা মেলতে হয়।
তাই জীবনের প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের আগে শুধু “আমি যদি ব্যর্থ হই?” এই প্রশ্নটি নয়, বরং আরো একটি প্রশ্নও নিজেকে করতে হয়:
“আমি যদি চেষ্টা না করি, তবে কি জানতে পারব যে আমি কতদূর উড়তে পারতাম?”

হয়তো আমাদের সামনে থাকা আকাশটি যতটা ভয়ংকর মনে হচ্ছে, তা তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর।
হয়তো আমাদের ডানাগুলো আমরা নিজেরাই যতটা দুর্বল ভেবেছি, আসলে তার চেয়ে অনেক শক্তিশালী।
তাই ভয়কে সঙ্গে নিয়েই ডানা মেলতে হয়।

কারণ উড়তে শেখা মানে কখনো না পড়ে যাওয়া নয়; উড়তে শেখা মানে পড়ে যাওয়ার ভয়কে অতিক্রম করে আবার ডানা মেলা।
আর কোনো দিন, সেই একটি সাহসী ঝাঁপই বদলে দেয় আমাদের পুরো জীবন।
বাসা হয়ত আমাদের আশ্রয় দিতে পারে, কিন্তু কেবল আকাশই আমাদের বলতে পারে যে আমরা আসলে কতদূর যেতে পারি।

লেখক: জেনারেল মেম্বার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।