বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

মুঘলযুগের গ্রীষ্মকাল

Author

মুহাম্মাদ যায়েদ আব্দুল্লাহ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২৬ পাঠ: ৫১ বার

বৈশাখের তীব্র তাপদাহে জনজীবন আজ অতিষ্ঠ। ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে হাফ হুতেশে দিন চলে যায়। একটু স্বস্তি পেতে কেউ বা আশ্রয় নেয় ডাল-পালার ছায়ায়, আর কারো দিন-রাত অতিবাহিত হয় এয়ার কন্ডিশনের কৃত্রিম শীতল বাতাসে। তথ্য-প্রযুক্তি উৎকর্ষের এই সময়ে গ্রীষ্মের গা-ঝলসানো রোদের তীব্রতায় এয়ারকন্ডিশন কিংবা ফ্যান যেন এক স্বস্তির আশ্রয়স্থল। কিন্তু, এ সকল বস্তু আবিষ্কারের পূর্বে মুঘল যুগের অধিবাসীরা গরমকে কীভাবে বরণ করে নিতো – আজ সেটাই জানবো।
মুঘলদের কারুকার্যময় নিপুণ স্থাপত্যশিল্পে সমাদর আজও অব্যাহত। চক্ষু শীতলতার অভ্যন্তরে তাদের স্থাপত্যে লুকিয়ে আছে নিখুঁত প্রকৌশলী। লাল বেলেপাথর ও মার্বেলের তৈরি পুরু গাঁথুনির দেয়ালগুলো সূর্যের তাপমাত্রাকে প্রশমিত করে রাজদরবার ও অন্দরমহলের পরিবেশকে রাখতো ঠান্ডা।
রাজদরবারের বৃক্ষ বেষ্টিত প্রবেশপথগুলো ছিলো প্রবেশকারীদের জন্য উষ্ণ অভ্যর্থনা মুলক। লাহোর ও দিল্লীর লাল কেল্লায় এ ধরনের প্রবেশপথ ছিলো। বিশাল উচ্চতার মহলের তুলনায় করিডোরগুলো ছোটো থাকায় প্রবাহিত গরম বাতাস রুমগুলোর উপরিভাগে অবস্থান করত; রুমের তাপমাত্রা থাকতো স্বাভাবিক।
মুঘলরা সাধারণত বাহির-দেয়ালে উজ্জ্বল সাদা বা ফ্যাকাশে রঙের পলিশকৃত মার্বেল ব্যবহার করতো। এর কারণ হচ্ছে – মার্বেলের তাপশোষণ ক্ষমতা। অন্যদিকে চুনের প্রলেপ ও সাদা রঙ সহজেই সূ্র্যের তাপকে প্রতিফলিত করে। ফলাফল – রাজপ্রাসাদে সূ্র্যের প্রখর তাপ সহজে প্রবেশ করতো না। এছাড়া, পাথর খোদাই করা জালিগুলো সূর্যালোককে ছেঁকে সবসময় বায়ু প্রবাহ নিশ্চিত করার ফলে প্রাসাদের পরিবেশ থাকতো সহনীয়।
রাজপ্রাসাদগুলো ছিলো জলাধারবেষ্টিত। জলাধারগুলো চত্বরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও বাষ্পীয় শীতলতা সরবরাহের আঞ্জাম দিতো।তাজমহল ও আগ্রার কেল্লায় গেলে এ ধরনের জলধারার দেখা পাওয়া যায়।
প্রাসাদ ও রাজদরবারের মেঝেগুলোতে ছিলো ছোট ড্রেনের মতো বিস্তৃত জলপথ, যা “চারবাগে” এখনও দেখা যায়। এ প্রবাহিত জলধারা অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রায় যোগ করতো শীতলতা। মধ্যপ্রদেশের সাদলপুরের জলমন্ডপে গ্রামবাসীরা এখনও আশ্রয় নেয় গরমের তীব্রতা থেকে নিস্তার পেতে।
বাওলি বলা হয় মাটির নিচে তৈরিকৃত এক ধরনের বিশালাকার কূপকে, যেখানে নামতে হয় সিঁড়ি বেয়ে। এ কূপগুলো প্রকৌশলীর এক চিত্তাকর্ষক কায়দায় নির্মিত। আবহাওয়ার ভয়ংকর ‘লু’‌ হাওয়া (গরম বাতাস)-কে ঠান্ডায় পরিণত করতো বাওলিগুলো। শাহ কোটলা বাওলি, আগ্রাসেন কি বাওলি ও রাজাওঁ কি বাওলির-মতো বেশ কিছু কূপের ধ্বংসাবশেষ এখনো ভারতে অবশিষ্ট।
রাজপ্রাসাদের নিচে ‘তেহখানা’ নামক ভূগর্ভস্থ ঘর তৈরি করা হতো। সেখানের তাপমাত্রা বাহিরের তুলনায় শীতল থাকতো। লাল কেল্লায় রংমহলের নিচে এমনই এক তেহখানার অবস্থান মিলেছে, যা উপরে থাকা প্রাসাদের মতোই জাঁকজমকপূর্ণ। মির্জা গালিব তাঁর কবিতায় তেহখানার কথা উল্লেখ আছে।
প্রযুক্তিগত নিষ্ক্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও মুঘলরা বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিতে বরফ তৈরি ও সংরক্ষণের উপায় বের করেছিল। হিমালয়ের নদী ও কাশ্মিরের পাহাড় থেকে বরফ সংগ্রহ করে তারা গ্রীষ্মের জন্য সংরক্ষণ করতো। কাশ্মির থেকে দিল্লীতে বরফ আনার জন্য যমুনা নদীর তীরবর্তী একটি সড়কপথ তৈরি করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য পুরু ও তাপ-নিরোধক দেয়ালযুক্ত ভূগর্ভস্থ বরফ ঘর ছিলো। বরফগুলোর জন্য বিশেষ কর্মচারী নিয়োগ ছিলো, যাদেরকে “আবদার” বলা হতো। সম্রাট জাহাঙ্গীরের গ্রন্থ – “তুজুক-ই-জাহাঙ্গীর”-এ বরফ সংরক্ষণের ব্যাপারে সবিস্তার উল্লেখ রয়েছে।
গ্রীষ্মকালে মোঘলরা পরিধান করতো মিহি মসলিন, সুতি ও ঢিলেঢালা রেশমের পোশাক। তাদের এই হালকা স্তর বিন্যাসকৃত পোশাকগুলো ঘামকে দ্রুত শুকানোর পাশাপাশি শরীরকে রাখতো শীতল ও স্বাভাবিক তাপমাত্রায়।
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রীনহাউজ ইফেক্টের কারণে বর্তমান আবহাওয়া তুলনামূলক বেশি তীব্র হলেও প্রযুক্তিগত সহায়তায় সেটাও আজ সামাল দেয়া সম্ভব। তবে, মোঘল সম্রাটরা উচ্চতর প্রকৌশলী ও সুনিপুণ দক্ষতায় যেভাবে গ্রীষ্মের দাবদাহ নিয়ন্ত্রণ করতেন, তা প্রশংসার দাবিদার বটেই।
লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।